কন্টেন্টে যাও

অগ্নি : মুভি(!) রিভিউ

“অগ্নি” সিনেমা নিয়ে বহুত কথা শুনলাম। এতোদিন দেখা হয় নাই, দেখার আগ্রহও অবশ্য বোধ হয় নাই। আজকে হাতের কাছে পেয়ে গিয়ে কি এমন বানিয়েছে দেখতে ইচ্ছা করলো। দেখার আগেই ধারণা ছিলো বাংলাদেশি গড়পড়তা সিনেমার কোর প্যাটার্ন থেকে বের হতে পারবে না। দেখতে গিয়ে ধারণা পাকাপোক্ত হলো। আমি রিভিউ লিখছি না, অগোছালো ভাবে যা মনে আসছে লিখছি, দেখি কতদূর পারি…

প্রথম সিকোয়েন্সটা “দ্যা এভেঞ্জারস”-এর ব্ল্যাক উইডোর চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় একশান সিকোয়েন্সটার নকল। নকল করুক, ভালো জিনিসের নকল করে শেখাও ভালো। কিন্তু এইদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির এমনই অবস্থা যে একটা সিকোয়েন্স ঠিকমতো নকল করবে সেই ক্ষমতাও নাই। সোজা কথায় পঁচিয়ে ফেলেছে সিকোয়েন্সটাকে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে এমন সব এলিমেন্ট ঢুকিয়েছে যেটা পরিচালকের বিকৃত মানসিকতারই পরিচয় দেয়। আর মাহী? অভিনয়ের বিন্দুমাত্র পারে কি না সন্দেহ। অকারণে অদ্ভুত সব মুখভঙ্গি, বিরক্তিকর ন্যাকামি টোনে কথা ব্লাহ ব্লাহ ব্লাহ…

ইংলিশ ডায়লগ? এরা ইংলিশ বলে চিবিয়ে চিবিয়ে। যেটা ঠিকমতো করতে পারে না সেটা না করাই ভালো। ডায়লগগুলো ঠিকভাবে বাংলায় দিলেও অসুবিধা ছিলো না…

গতানুগতিক ভুম-ভাম, ঠুস-ঠাস শব্দ করে পর্দার দৃশ্য ঘনঘন চেঞ্জ করেছে। আরেফিন শুভর এন্ট্রি সিকোয়েন্স? স্লো মোশানে দৌড়ে এসে ছাদ থেকে ভুম আর ঝুম-এর মাঝামাঝি শব্দ করে সুপারম্যান তরিকায় লাফ দিয়ে ল্যান্ডিং করার দরকারটা কি ছিলো? একশান? কমেডি বানিয়ে ফেলেছে। উনি এক ফ্লোর থেকে অন্য ফ্লোরে লাফ দিয়ে উঠতে পারেন।

বাংলাদেশি মানুষগুলা কথা বলে চিবিয়ে চিবিয়ে ইংলিশে। আর বিদেশি মানুষগুলা উদ্ভট উচ্চারণে বাংলাতে। কেন, বিদেশিগুলাকে ইংরেজিতে ডায়লগ দেয়ালে সমস্যা হয়ে যেত? যেত মনে হয়, কমেডিটা ঠিক জমতো না…

একশন মুভির একশন নায়িকা বলে কথা। মারামারি করার সময় মাহীর মুখ দিয়ে “আহ”, “উহ” বাইর হতে থাকে থামাথামি ছাড়া। মারামারির মাঝেও উনি ঢঙ্গি-ঢঙ্গি ভঙ্গি করেন এবং মারামারি শেষে অকারণ মুখের সামনে থেকে চুল সরানোর ভঙ্গি করেন। বাইকে চড়েও উনি “আহ” শব্দ করেন উনার পিছনে বাইক নিয়ে ধাওয়া করা আরেফিন শুভ বিরতিহীনভাবে উনাকে রিকোয়েস্ট করতে থাকেন “স্টপ ইট, স্টপ ইট!”…

হিন্দি সিনেমার মতো নিয়মকরে আইটেম সং ঢুকানো হয়েছে। অতি ভালো কাজ করেছে। আইটেম সং না ঢুকালে চলবে কেমন করে? সিনেমায় তো দেখার কিছু নাই, আইটেম দিয়ে যদি কিছু দর্শক টানা যায়। গতানুগতিক হিন্দি সিনেমার অব্যর্থ সিস্টেম বলে কথা। আইটেম সংয়ে মাহীর কস্টিউমটা ক্যাটরিনা কাইফের “শীলা কি জাওয়ানি” থেকে মেরে দেয়া…

মাহীর ছোটবেলার ঘটনা “কলম্বিয়ানা” সিনেমা থেকে মেরে দেয়া, ভদ্র ভাষায় যাকে বলে অনুপ্রাণিত। কলম্বিয়ানার কলা-কুশলীরা এই জিনিস দেখলে লজ্জা পেয়ে যেতো। এই প্রসঙ্গে পরে আসছি…

আমাদের অগ্নি(মাহী) জলের মধ্যে সাঁতার দিয়ে চলমান ইয়ট ধরে ফেলেন। তেমন কিছু না, পিস অফ কেক। ইয়টে উঠে মারামারি করার সময় উনার বিখ্যাত “আহ”, “উহ” চলতে থাকে। উনি নড়াচড়া করার সময় ভুম-ভাম আওয়াজ হয়। কেউ হাসাহাসি করবেন না। সাইন্সে এটার ব্যাখ্যা আছে — শব্দ অনুপ্রস্থ তরঙ্গ ইত্যাদি ইত্যাদি। যাই হোক, কাজ শেষ করে উনি পালানোর সময় পেছন থেকে আরেফিন শুভর কাকুতি-মিনতি চলতে থাকে “স্টপ ইট, স্টপ রাইট দেয়ার”। মাহী স্বচ্ছ পানিতে ডাইভ দেন এবং শুভ সাহেব একটা গুলিও উনাকে লাগাতে পারেন না। মুহূর্তবাদে উভয়ে ওয়াটার ভেহিকল(নাম গেছি ভুলে) নিয়ে উদয় হন। ঐগুলা কোথা থেকে আমদানী হলো জিজ্ঞেস করে লজ্জা দেয়ার মানে নাই। তারপর ডাঙায় উঠে ধাওয়া এবং কমেডি কন্টিনিউস…

কমেডি যে সবজায়গায় খারাপ লাগে তা অবশ্য না। কিছু কিছু জায়গায় ঠিক আছে। কিন্তু মোটমাট একটা একশান সিনেমা হিসেবে সব ভজহট করে ফেলেছে। নায়ক-নায়িকা লিফটে, লিফট যাহ বন্ধ হয়ে। এই অতি পরিচিত সিকোয়েন্স না ঢুকালেও পারতো, অতিমাত্রায় সস্তা জিনিস…

ফ্যাক্ট, অগ্নির চেহারা কেউ দেখে না। তিনি আপনার সামনে দিয়ে চলে গেলেও দুই সেকেন্ড বাদে আপনি তিনার চেহারা ভুলে যাবেন। উনি মোটামুটি পাঁচ-ছয় তলার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে খাড়াভাবে ল্যান্ডিং করেন এবং পড়ন্ত অবস্থায় পড়ন্ত বস্তুর সূত্র (বিজ্ঞান বই ঘাটুন) হিসাব করে অভিকর্ষজ ধ্রুবক সমন্বয় করে গুলি চালিয়ে টার্গেটের হেডশট নিতে পারেন। হাত ঘুরিয়ে গুলি করার স্টাইল দেখে অবচেতন মনে “ওয়ান্টেড” মুভির কথা (থামেন, কি মনে করসেন? হিন্দিটা? ধুর মিয়া, ইংলিশটার কথা বলতেসি) চলে আসে, আমার কোন দোষ নাই…

রিভলভার দিয়ে সেমি-অটোমেটিক গানের মতো ফায়ার কিভাবে করে বুঝলাম না। আমার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা বলেই ধরে নিচ্ছি।

ফাইভ থাউজেন্ড ডলার মানে কত টাকা হিসাব আছে? গাঁজায় দম দিয়ে স্ক্রিপ্ট লিখেছিলো নাকি? বাই দ্যা ওয়ে, এই সিনেমায় রক্তের ঘনত্ব কম, হেহে। অগ্নির চেহারা দেখতে শুভ সাহেব আবারো ব্যর্থ এবং পেছন থেকে “স্টপ” আকুতি চলমান। তবে এবার গুলি লাগাতে পেরেছেন যা কিনা পায়ের ধার ঘেষে বেরিয়ে গেছে। সীমারও একটা প্রোবাবলিটি আছে…

“কলম্বিয়ানা”য় ফিরে আসা যাক। অগ্নির বাপের মোটামুটি লোহার শরীর। বুকে-পেটে ডজনখানেক গুলি খেয়েও মাথা উঁচু করে যে তেজের সাথে ডায়লগ ডেলিভারি করলো তা দেখে চাক নরিসেরও চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার সম্ভবনা আছে। যাই হোক, গুলির তুলনায় গর্ত কম হয়। পাঁচ-ছয়টা গুলি খেলে গর্ত হয় একটা। এটা হতেই পারে, এক গর্ত দিয়েই হয়তো অনেকগুলা গুলি ঢুকেছে। গণিতে প্রোবাবলিটি নামক একটা ব্যাপার আছে। পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে যতগুলা গুলি এই সিনেমায় মিস করেছে সেটা গিনেজ বুকে নাম উঠে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই সিকোয়েন্সটা দেখলে “কলম্বিয়ানা”র কলা-কুশলীরা শুধু লজ্জা না, লজ্জায় মারা যেতো। নকল করার মাঝেও একটা আর্ট থাকে। এরা নকলও করতে পারে নাই, বিচ্ছিরিভাবে পঁচিয়ে ফেলেছে ব্যাপারটা…

সিনেমার গান মোটামুটি ভালোই…

শুধু চিবিয়েই না, ভুলভাল ইংলিশ ডায়লগও ডেলিভারি করতে এরা পটু। মাহী নাকি একশন(!) হিরোইন, সারাক্ষণ “আহ”, “উহ” করে। শুভ সাহেবের অকারণ লাফঝাপ দেয়ার অভ্যাস যায় নাই। মিস মাহী তিনার কাঁচা অভিনয়, স্থূল এক্সপ্রেশান চালিয়ে যাচ্ছেন। লুতুপুতু ডায়লগও সমানে ডেলিভারি দেয়া হয়। নায়ক-নায়িকার গুলি চালানোর অপেক্ষায় চ্যাং-ব্যাং সবাই দাঁড়িয়ে থাকে রিভলভার হাতে। রিভলভারের গুলি খেয়ে তারপর উড়ে গিয়ে দুইহাত দূরে পড়ে। “মিস্টার এন্ড মিসেস স্মিথ”কেও কি পঁচায়ে দিলো নাকি?! গজব পড়া দরকার এদের উপর…

নায়ক-নায়িকার শুভ মিলন এবং সিনেমার সমাপ্তি…

গতানুগতিক বাংলা ছিঃনেমাগুলোর সাথে কোন পার্থক্যই পেলাম না। সেই একই কোর এলিমেন্ট, সাথে একটু আলাদা রঙ-চঙ। কোথায় যেন পড়েছিলাম, মাহীকে হলিউডের একজন অভিনেত্রীর সাথে তুলনা করা হচ্ছে (নাম উল্লেখ করে তাঁকে অপমান করার প্রয়োজন দেখি না)। কাম’ন, তুলনা করার সময় হুঁশ-জ্ঞান রেখে তুলনা করুন। অনেকেই এই মুভি নিয়ে পজিটিভ অনেক কথা বলেছে। আমি পজিটিভ কিছুই খুঁজে পেলাম না। হয়তো পজিটিভ কিছু খুঁজে পাওয়ার মতো কিছুই নেই মুভিতে অথবা আমার মুভি টেস্ট অত্যন্ত নিম্নমানের, থার্ড ক্লাস। আর কিছু লিখতে ইচ্ছা করছে না…

( মে ১, ২০১৪ )