কন্টেন্টে যাও

হ্যাঙ্গম্যান'স নট

ফ্যানের সাথে ঝুলতে থাকা ফাঁসটা ধরে আরেকবার জোরে টান দিলো শিহাব। নাহ, গিঁট দেয়া ঠিকই আছে, খুলে পড়বে না। দুশ্চিন্তাটা অন্য জায়গায়। ফ্যানই খুলে পড়ে যাবে নাকি বোঝা যাচ্ছে না। খুলে পড়লে পরে দেখা যাবে। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পড়ার টেবিলের চেয়ারটা টেনে নিয়ে জানালার পাশে বসলো শিহাব। টেবিলের ওপর থেকে চায়ের কাপটা টেনে নিলো। চুমুক দিতেই মুখ বিস্বাদ হয়ে গেলো। ঠান্ডা হয়ে গেছে চা। কালো রঙের একটা পিঁপড়াও দেখা যাচ্ছে চায়ের ওপর। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো শিহাবের। চোখ তুলে ফ্যানের সাথে ঝুলতে থাকা ফাঁসটার দিকে তাকালো। আরেকটু মোটা দড়ি হলে ভালো হতো। দড়িটা কিনে দিয়েছে রাফকাত। এইটুকুন দড়ির জন্য নগদে আড়াইশ’টাকা হাতিয়েছে শালা। দড়ির দাম নিয়ে শিহাবের দরকষাকষির মুড ছিলো না দেখে ব্যাটা এই সুযোগ পেয়েছে। এখন শিহাবের ইচ্ছা করছে ফোন করে রাফকাতকে কঠিনভাবে ঝাড়ি দিতে। এইটুকু দড়ির দাম কিভাবে আড়াইশ’টাকা হয়! মগের মুল্লুক নাকি! অবশ্য ঝাড়ি দিয়ে লাভের কিছু হবে না, মাঝখান দিয়ে অকারণ মোবাইলের কিছু ব্যালেন্স পুড়বে। ঝাড়ি-টাড়ি এই ব্যাটা এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দেবে। দড়ি কেনার কথা বলে সকাল ১০টার দিকে রাফকাতকে ফোন করেছিলো সে,

হ্যালো, রাফকাত?

নাহ, রাফকাত নাহ! তোর গার্লফ্রেন্ডের ভাই বলতেছি, শালা!

ধুর শালা! আজাইরা প্যাঁচাল বাদ দে। কাজের জন্য ফোন করছি। একটা কাজ করে দিতে পারবি?

কি কাজ?

একটা জিনিস কিনে বাসায় ডেলিভারি দেয়া লাগবে, যত দ্রুত সম্ভব। তুই কই আছিস?

তোর জিনিস তুই কিনতে পারিস না? নবাব হইলি কবে থেকে?

আজাইরা প্যাঁচাল বাদ দে। দিতে পারবি কি না বল। নাইলে অফ যা।

কি জিনিস?

দড়ি।

কি কাজের জন্য দড়ি?

কি কাজ দিয়ে তোর দরকার কি?

শালা বলদ! আমি চিকন দড়ি নিয়ে আসলাম আর তুই সুইসাইড করার জন্য সেটায় ঝুলে পড়ে আছাড় খেলি, তাইলে তো হবে না। তাই জিজ্ঞেস করছি কি কাজ…

ও, বুঝছি। তাইলে মোটা দড়ি আনিস।

তুই টাকা রেডি রাখ।

বলেই ফোন কেটে দিলো রাফকাত। শিহাব বসলো তার ল্যাপটপ নিয়ে। ইউটিউবে ঢুকে “হ্যাঙ্গম্যান’স নট” বাঁধার ভিডিও টিউটোরিয়াল দেখতে শুরু করলো। সে ভেবেছিলো ঘন্টাখানিকের মধ্যে রাফকাত চলে আসবে। রাফকাত আসলো বারো ঘন্টা পর। শিহাব ততক্ষণে প্রায় শ’দুয়েকবার ভিডিও টিউটোরিয়াল দেখা শেষ করে ফেলেছে। দেখতে দেখতে এমন অবস্থা হয়েছে যে তার মনে হচ্ছে চোখ বন্ধ করেও সে প্রথম চেষ্টাতেই হ্যাঙ্গম্যান’স নট বেঁধে ফেলতে পারবে। দরজা খুলে দেখে রাফকাত একটা ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে হাই তুলছে। শিহাবকে দেখেই বলে উঠলো,

দোস্ত, তোর এইখানে ঘুমানো যাবে আজকে রাতে? প্রচণ্ড কাহিল লাগছে, বাসায় যেতে ইচ্ছা করতেছে না। তুই এখানে ঘুমাতে না দিলে রাস্তায় ঘুমিয়ে পড়ে থাকবো মনে হয়।

শিহাব বিরক্ত কণ্ঠে উত্তর দিলো,

শালা, তোরে বললাম যত দ্রুত সম্ভব দড়ি আনতে আর তুই আইছিস এতোক্ষণ পর, আইসা বলিস ঘুমানোর কথা! দড়ি আনছোস?

এর মানে কি এখানে ঘুমাতে দিবি না?

দড়ি কই?

রাফকাত আরেকটা বড় সাইজের হাই তুলে বললো,

দড়ি ব্যাগে। আড়াইশ’টাকা বের কর। দড়ির দাম। দড়ি দিয়ে বিদায় হয়ে যাচ্ছি। ঘুমাতে যে দিবি না এইখানে বোঝাই যাচ্ছে। শালা খাইষ্টা!

টাকা দিয়ে দ্রুত রাফকাতকে বিদায় করে দিলো শিহাব। অন্য কোন দিন হলে ঘুমাতে দেয়া যেতো এই বাসায়। আজকে সেটা অসম্ভব। ঘুমাতে না দেয়ার জন্য তখন রাফকাতের জন্য মায়া লাগছিলো শিহাবের। এখন মনে হচ্ছে যাওয়ার সময় পাছায় দুইটা লাথি মেরে দেয়া উচিত ছিলো। এইটুকু দড়ির জন্য আড়াইশ’টাকা হাতিয়েছে শালা! জানলা দিয়ে তার বের করে শিহাব ঠাণ্ডা চাসহ কাপ ফেলে দিলো। সেটা মাটিতে পড়ে ভেঙে যাওয়ার শব্দ স্পষ্ট শোনা গেলো। রাতের বেলা সব নিস্তব্ধ। চেয়ারটা তুলে বিছানার ঠিক মাঝখানে রাখলো। চেয়ারের ঠিক উপর বরাবর ফ্যান থেকে ফাঁস ঝুলছে। চেয়ারের উপর উঠে দাঁড়ালো শিহাব। ফাঁসের মধ্যে মাথা ঢুকালো। সময়টা দেখে নেয়া দরকার। প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে মোবাইল বের করে চোখের সামনে ধরলো সে। রাত দু’টো তেত্রিশ মিনিট। মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো আবার। ফাঁসের উপর সাতটা প্যাঁচ দিয়েছে সে। সাত হলো সৌভাগ্যের সংখ্যা। মৃত্যুর সময়ও সেটাতে সৌভাগ্যের স্পর্শ থাকা উচিত। এই প্যাঁচগুলো কিন্তু এমনি এমনি দেয়া হয় না। প্যাঁচ যতো বেশি হয় ফাঁস ছোট-বড় করার সময় ঘর্ষণ ততো বেশি হয়, ফলে ছোট-বড় করতে বেশি শক্তি লাগে। হ্যাঙ্গম্যান’স নট বাঁধার সময় প্রয়োজন মতো প্যাঁচের সংখ্যা কম-বেশি করা যায়। শিহাব ফাঁস ছোট করে গলার সাথে একদম লাগিয়ে দিলো। এখন শুধু পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে চেয়ারটা ফেলে দিতে হবে, তাহলেই কাজ শেষ। উল্টোভাবে তিন থেকে এক পর্যন্ত গুণে কাজটা করা যায়। অথবা সাত থেকে শুরু করা যেতে পারে। সাত হলো সৌভাগ্যের সংখ্যা। শিহাব মনে মনে গোনা শুরু করলো।

সাত…

ছয়…

পাঁচ…

চার…

তিন…

টুং শব্দ করে প্যান্টের পকেটে রাখা মোবাইলটা কেঁপে উঠলো। ম্যাসেজ এসেছে। এইসময় কে ম্যাসেজ পাঠালো! সবসময় ডিস্টার্বেন্স! কোন কাজ করেই শান্তি নাই। পকেট থেকে মোবাইল বের করে আবার চোখের সামনে ধরলো শিহাব। নীলার ম্যাসেজ। ওপেন করলো সেটা,

“ঐ শিহাব… সকাল এগারোটায় আরএকে টাওয়ারে দেখা করবি… কিছু কেনাকাটা করতে হবে… তোর কোন এক্সকিউজ আমার কাছে চলবে না সেইটা তুই ভালোমতোই জানিস… তাই ভদ্র পোলার মতো চইলা আসবি… সময়মতো যদি না দেখি তাইলে তোরে আমি কাচ্চা চিবায়ে খেয়ে ফেলবো… টাটা…”

নাহ! নীলা একটা ডেডবডি খুবলে চিবায়ে খাচ্ছে এই দৃশ্য মেনে নেয়া যায় না। আজকে মনে হয় আর হলো না। কি আর করার…

( ডিসেম্বর ৬, ২০১৩ )