কন্টেন্টে যাও

রিপার

রুহা, তুমি কি আমার কথা শুনতে পারছো?

না পারার কোন কারণ আছে কি?

আছে, একটু আগে তোমার শরীরে যে রাসায়নিক পদার্থ ইনজেক্ট করা হয়েছে সেটা এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে। সেটার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে অনেকের দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, বাকশক্তি সাময়িকভাবে লোপ পেতে দেখা গেছে। তবে তুমি শুনতে পারছো জেনে খুশি হলাম।

তোমার খুশি হওয়ার মতো কিছু ঘটে নি।

রাসায়নিক পদার্থটা কেনো ইনজেক্ট করা হয়েছে তুমি জানো?

আমার কি জানার কথা?

জানার কথা। তুমি আমার কোন প্রশ্নের উত্তর তুমি সরাসরি দিচ্ছো না। কেন জানতে পারি?

অবশ্যই জানতে পারো। আসলে তুমি ইতোমধ্যে জেনে গেছো। আমার উত্তর দেয়া না দেয়ায় তোমার কিছু যায় আসে না।

নিমি তার সামনে রাখা মনিটরটা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রুহার দিকে তাকালো। মাঝবয়সী তরুণ, লম্বা চুল ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে। শান্ত চেহারা, স্থির দৃষ্টিতে নিমির দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের আইরিশ হালকা নীল। নিমির তার ছেলেবন্ধুর কথা মনে পড়ে যায়। ওর চোখ দু’টোও নীল ছিলো। মাঝে মাঝে বিকেলবেলা ওরা দু’জন সমুদ্রপাড়ে যেয়ে বসতো। অনেকটা সময় নিমি ওর চোখের দিকে তাকিয়েই কাটিয়ে ফেলতো। কি নিষ্পাপ ছিলো সেই দৃষ্টি! রুহার ভেতরও এই ব্যাপারটা আছে। রুহার চোখের দিকে তাকিয়ে কেউ কি বিন্দুমাত্র টের পাবে এই মানুষটা কে? রুহার হাত-পায়ের পেশী এখন সব অবশ, ইনজেক্ট করা রাসায়নিক পদার্থের কাজ। ইচ্ছে করলেও রুহা এখন আর নড়াচড়া করতে পারবে না। মনিটরের উপর দু’তিন জায়গায় চাপ দিয়ে নিমি রুহার হাত-পা ধাতব স্ট্র‍্যাপ থেকে মুক্ত করে দিলো। নিজের চেয়ার থেকে উঠে এসে রুহার চেয়ারটার পেছনে দাঁড়ালো সে,

তুমি হয়তো জানো না, তোমার সাথে এই ছোট্ট ইন্টারভিউটার অনুমতি জোগাড় করার জন্য আমার অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।

তুমি আদিম যুগের মানুষদের মতো কথা বলছো। কাঠখড় পোড়ানোর মতো অবান্তর কথা এখন আর কেউ বলে না।

হ্যা, বলছি। বলছি তার পেছনে কারণও আছে।

রুহার মাথার দু’পাশে লাগানো সেন্সরগুলো খুলতে খুলতে নিমি বলতে থাকলো,

তোমার কাছে হয়তো তোমার পরিচয় সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য নেই। তুমি কিন্তু সেই আদিম যুগ থেকেই এসেছো।

সেটা কে আসে নি?

তোমার সাথে আমার কথাবার্তাটাও সেই আদিম যুগের মতোই হবে। তুমি কি চিন্তা করছো সেন্সরের মাধ্যমে সেটা আর আমার মনিটরে ভেসে উঠবে না।

রুহা মুখ বিকৃত করে হাসলো কিছুক্ষণ,

তুমি কি জানো সেটা কতটুকু বিপদজনক?

নিমি নিজের চেয়ারে বসে তার ব্যাগ থেকে একটা কাগজের প্যাড আর একটা পেন্সিল বের করে আনলো। সেখানে খসখস করে লিখলো,

নাম : রুহা ২৮/ডব্লিউ

পরিচয় : “দ্যা রিপার” নামে পরিচিত ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত সিরিয়াল কিলারের টিস্যু থেকে সৃষ্ট ক্লোন (এরকম মানুষের ক্লোন করার পেছনে কারণ অজ্ঞাত; ধারণা করা হয়, অনেক উচ্চ পর্যায়ের স্থান থেকে অনুমোদনপ্রাপ্ত কোন গোপন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার অংশরূপে এটা করা হয়েছে)

অপরাধ : নিজের স্ত্রী ও তিন বছর বয়সী ছেলেকে ঠান্ডা মাথায় জঘন্য উপায়ে খুন

লেখা শেষ করে নিমি রুহার দিকে তাকালো। রুহা মুখ বাকা করে হাসছে। নিমি বললো,

বিপদের কথা চিন্তা করার মতো যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা আছে দেখেই এই ইন্টারভিউটার অনুমতি আমাকে দেয়া হয়েছে। তুমি হাসছো কেন?

তোমার কাজ দেখে। তুমি পেন্সিল-কাগজ নিয়ে বসে গেছো। এখনকার সময়ে এটা সাধারণত কেউ করে না।

নিমি রুহার কথা এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি নিজের প্রশ্নে চলে আসলো,

তোমার স্ত্রী আর ছেলেকে হত্যা করেছিলে কেন তুমি?

আমার স্ত্রী। তুমি কি জানো ইরি অনেক সুন্দরী ছিলো? আমি ওর সৌন্দর্যটাকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতাম। অবশ্য সেটা ছাড়া আর পছন্দ করার মতো কিছু ছিলোও না। তুমি যখন সবকিছু আদিম যুগের মতো করেই করছো, তাহলে সেরকমই উপমা দিচ্ছি। ইরির বুদ্ধিমত্তা ছিলো ভারবাহী গাধার পর্যায়ের। একটা মহিলা গাধার সাথে দিন কাটানো কতটুকু পর্যন্ত বিরক্তিকর হতে পারে তোমার ধারণা আছে?

এটুকু বলে রুহা থামলো। খসখস শব্দে আরো দু’সেকেন্ড লিখে নিমি রুহার দিকে তাকালো,

আমি অনুমান করতে পারি।

তুমি অনুমানও করতে পারো না। নীল চোখের তোমার যে ছেলেবন্ধুটা ছিলো সে যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছিলো। বিরক্তির সেই পর্যায় তোমার ধারণার বাইরে।

নিমি এবার চমকে রুহার দিকে তাকালো। নিমির ছেলেবন্ধুর সম্পর্কে এই লোকটার জানার কোন কারন নেই,

তুমি তার কথা কিভাবে জানো?!

রুহা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বিকৃত মুখভঙ্গিতে হাসলো। তারপর আগের কথার রেশ ধরে বলতে থাকলো,

আমার সহ্যসীমাও ছাড়িয়ে গেলো একসময়। কিচেনের স্যালাড কাটার চাকুটা ঠিক ওর পেট বরাবর ঢুকিয়ে দিলাম। চোখ বড় বড় করে চেয়ে ছিলো আমার দিকে। আমার সেটা পছন্দ হলো না। একটা কাটা চামচ নিয়ে বাম চোখটায় গেঁথে দিলাম। চিৎকার করছিলো মহিলা গাধাটা। আমাকে আক্রমণ করার জন্য হাত পা ছুড়ছিলো। আরেকটা চাকু নিয়ে হাতের পাতা দু’টো একসাথে গেঁথে দিয়ে চাকুর দু’মাথা বাঁকিয়ে দিলাম।

কথা থামিয়ে রুহা নিমির দিকে তাকালো আবার। নিমির লেখা বন্ধ হয়ে গেছে। স্থির দৃষ্টিতে রুহার দিকে চেয়ে আছে। হত্যা করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটা নিমির জানা। সবকিছু রেকর্ডে লেখা আছে। কিন্তু এই লোকটার মুখ থেকে একই জিনিস শুনতে গিয়ে নিমির শরীরের পেশী সব আড়ষ্ট হয়ে গেছে। নিমি বললো,

তোমাকে কিভাবে হত্যা করেছ তা বর্ণনা করতে হবে না। কেন করেছ তা জিজ্ঞেস করা হয়েছে। তোমার ছেলের কথা বলো।

রুহা মেঝের দিকে তাকিয়ে হাসলো একবার। তারপর বললো,

তুমি কি জানো যে আমি জেনেটিক্যালি মডিফাইড? সাধারণ মানুষের সাথে আমার বেশ কিছু পার্থক্য আছে?

নিমি সরু চোখে রুহার দিকে তাকালো। এই তথ্য তার জানা ছিলো না। রুহা বলতে থাকলো,

আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কেউ কিছু চিন্তা করলে আমি মাঝে মাঝে তা বুঝতে পারি। মাঝে মাঝে। প্রক্রিয়াটা ঠিক কিভাবে ট্রিগার করতে হয় আমি এখনো বুঝে উঠতে পারি নি। তাই সবসময় সম্ভব হয় না। তোমার তথ্যগুলো জানা উচিত ছিলো। তাহলে আর দুর্ঘটনাটা হতো না।

কি দুর্ঘটনা?!

তুমি কি জানো মানুষের কোন অঙ্গটা সবচেয়ে সুন্দর?

নিমি চুপ করে থাকে। রুহা নিজেই জবাব দেয়,

চোখ। চোখ খুব কাছাকাছিভাবে মস্তিষ্কের সাথে সংযুক্ত থাকে…

এরপরের ঘটনাগুলো ঘটলো খুব দ্রুত। সেকেন্ডের ব্যবধানে যখন নিরাপত্তা কর্মীরা রুমের দরজা ঠেলে ঢুকলো তখন নিমির নিথর দেহটা চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছে। নিমি যেই পেন্সিলটা দিয়ে লিখছিলো সেটার গোড়ার কিছুটা অংশ বের হয়ে আছে তার চোখের কোটর থেকে। রুহা শান্তভঙ্গিতে টেবিলের উপর বসে আছে। তার ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসি ঝুলন্ত। একজোড়া নীল চোখের স্থির দৃষ্টি নিমির মুখের দিকে তাকিয়ে।

( মে ৪, ২০১৪ )