কন্টেন্টে যাও

একজন রাফকাত ও কেউ একজন

ট্যাক্সিক্যাব থেকে নেমেই রাফকাতের মনে হলো সে হঠাৎ করে অন্য কোন জগতে ঢুকে পড়েছে। চারপাশ সাদা কাশফুল দিয়ে ভর্তি। ট্যাক্সিক্যাবের ভাড়া দেয়ার কথা ভুলে গিয়ে সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ কাশবনের দিকে তাকিয়ে থাকলো। এরকম চমৎকার কোন জায়গায় তার অনেকদিন আসা হয় না। ট্যাক্সিক্যাব চালকের ডাকে তার ভাড়ার কথা মনে হলো। ভাড়া মিটিয়ে রাস্তা থেকে নেমে সে দ্রুতপায়ে কাশবনের ভেতর ঢুকে পড়লো। ইট-পাথরের শহরের মাঝে হঠাৎ করে এরকম কাশবনের দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। কাশবনে ঢোকার পর রাফকাতের হাঁটার গতি কমে গেলো। বেশ খানিকটা আগেই চলে এসেছে সে। হাতে এখনো মিনিট পনেরো সময় আছে। এই সময়টুকু একাই পার করতে হবে। হাঁটতে হাঁটতে একটা খালি জায়গা পেয়ে বসে পড়লো রাফকাত। মাথা তুলে উপরে তাকালে শুভ্র মেঘে ঢাকা আকাশ দেখা যায়। চারপাশে তাকালে দেখা যায় কাশফুলের মেলা। সেগুলোর শুভ্রতাও যেন মেঘের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। একটানা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। বাতাসে কাশফুল দোল খাচ্ছে, আকাশের মেঘেরাও তাতে ভেসে বেড়াচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে একটা ঘোর লাগা ব্যাপার আছে পরিবেশটায়। তাকিয়ে থাকলে মাথা ঝিমঝিম করে, চোখ বুজে আসতে চায়। কিন্তু জোর করে চোখ খুলে রাখতে ইচ্ছা করে, চোখ বুঝলে বাতাসের স্পর্শগুলোকে যেন আর অনুভব করা যাবে না। রাফকাতের মুঠোফোনটা কেঁপে উঠলো। সেটা পকেট থেকে বের করলো সে। সুরাইয়া ফেসবুকে ম্যাসেজ দিয়েছে।

কই তুমি?

এখনকার মুঠোফোনগুলোয় অনেক সুবিধা। মুঠোফোনগুলো এখন হয়েছে স্মার্টফোন। এমনিতে অবশ্য এই নাম হয় নি, নামের সাথে কাজেরও মিল আছে। সুরাইয়ার ম্যাসেজের সাথে সে কোথায় আছে সেটাও জানা যাচ্ছে সেটায়। সুরাইয়া আশেপাশেই কোথাও আছে, কাশবনে পৌঁছে গেছে। রাফকাত যে ম্যাসেজটা দেখেছে সেটাও নিশ্চয়ই সুরাইয়া জেনে গেছে। রাফকাত ম্যাসেজের উত্তর দিলো না। ইচ্ছা করেই দিলো না। সে জানে উত্তর না দিলেও সুরাইয়া রাগ করবে না। সে আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো না। রাফকাত মুঠোফোনটাকে সাইলেন্ট করে দিলো, সুরাইয়া কল করবে এখনি। সাইলেন্ট করতে না করতেই সেটা কাঁপা শুরু করলো। সুরাইয়ার কল এসে গেছে। রাফকাত সেটা পাশে ঘাসের মধ্যে রেখে মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকালো। কল রিসিভ না করলেও সুরাইয়া রাগ করবে না। রাগ না করার কারণ আছে। রাফকাতের কোন কিছুতেই সে রাগ করে না। বেশ কিছুক্ষণ কেঁপে মুঠোফোনটা ক্লান্ত হয়ে থেমে গেলো। সেটাকে মুঠোতে নিয়ে রাফকাত উঠে দাঁড়ালো। কাশবন থেকে বের হয়ে উঁচু জায়গায় দাঁড়াতে হবে। সুরাইয়া কোথায় দেখা দরকার। রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই তাকে চোখে পড়লো। চমৎকার একটা শাড়ি পরেছে সে। শাড়ির দিকে তাকালে মনে হয় কেউ একজন আকাশ আর মেঘগুলোকে পানিতে গুলে সেটায় রঙ করে দিয়েছে। কাশবনের পাশে একটা লেক আছে। লেকটা আগে চোখে পড়ে নি রাফকাতের। সুরাইয়া লেকটার পাড় ধরে চুপচাপ হাঁটছে। একটানা বয়ে যাওয়া বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলোকে সে মাঝে মাঝে মুখের সামনে থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। রাফকাতের এখন চুপিচুপি পিছন দিয়ে গিয়ে সুরাইয়াকে চমকে দিয়ে হাতটা ধরতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু সেটা সে করবে না। অনিয়ন্ত্রিত আবেগ ব্যাধির মতো। ছোট্ট একটা ক্যান্সার কোষ যেমন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হয়ে সম্পূর্ণ দেহকে অসহায় করে ফেলে, অনিয়ন্ত্রিত আবেগও বৃদ্ধি পেতে পেতে একসময় সেরকম অবস্থা হয়। আবেগের কাছে তখন মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে।

রাফকাত নিঃশব্দে এসে সুরাইয়ার পাশে হাঁটা শুরু করলো। সে ভেবেছিলো সুরাইয়া হয়তো অবাক হয়ে তার দিকে তাকাবে বা চমকে উঠবে। সুরাইয়া সেসবের ধার দিয়েও গেলো না। যেভাবে একমনে হেঁটে যাচ্ছিলো সেভাবেই হাঁটতে থাকলো। রাফকাত সুরাইয়ার এই ব্যাপারটা ঠিক ধরতে পারে না। মাঝে মাঝে খুব সাধারণ বিষয়েও সুরাইয়া চমকে যায়। এতোই সাধারণ বিষয়ে চমকায় যে তার চমকানো দেখে রাফকাত নিজেই অবাক হয়ে যায়। আবার চমকানো উচিত এমন অনেক বিষয়ে সুরাইয়া রাফকাতকেই অবাক করে দিয়ে একদম স্বাভাবিক থাকে। অবাক হয়ে যাওয়া রাফকাতের প্রত্যেকবারই বলতে ইচ্ছা করে, সুরাইয়া তুমি আশ্চর্য একটা মেয়ে। কিন্তু সে বলে না। সুরাইয়া যে আশ্চর্য একটা মেয়ে সেটা সুরাইয়া ভালোভাবেই জানে। আলাদাভাবে সেটা তাকে জানানোর কোন প্রয়োজন নেই।

বসি?

সুরাইয়া ছোট্ট করে উত্তর দিলো,

হুম।

রাফকাত লেকের পাড়ে ঘাসে ঢাকা একটা জায়গায় এসে সুরাইয়াকে বসতে ইশারা করলো। ঘাসগুলো বেশ লম্বা লম্বা। এগুলোকেই কি দুর্বা ঘাস বলে নাকি? সুরাইয়ার কাছ থেকে জেনে নিতে হবে। সুরাইয়া শাড়ির আঁচল গুছিয়ে নিয়ে বসে পড়লো। সেই আঁচল গুছিয়ে নেয়ার দৃশ্য রাফকাতকে মুগ্ধ করলো। সে বসলো একটু দূরত্ব রেখে। বাতাসে লেকের পানিতে ছোট ছোট জলতরঙ্গ সৃষ্টি হয়েছে। জলতরঙ্গে সুরাইয়ার আবছা প্রতিবিম্বটা ওঠা-নামা করছে। রাফকাতের দৃষ্টি সেদিকে। সেদিকে না তাকিয়ে সুরাইয়ার মুখের দিকে তাকালে সে খেয়াল করতো সুরাইয়া ভ্রু কুঁচকে অভিমানী দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে।

আচ্ছা, এই ঘাসগুলাকেই কি দুর্বা ঘাস বলে নাকি?

জানি না। আমাকে জিজ্ঞেস করছো কেন?

এমনিই, মনে হলো তুমি জানতে পারো, তাই…

ভুল মনে হয়েছে। দুনিয়ার সবকিছু আমি জেনে বসে নেই।

সুরাইয়ার বলার ভঙ্গি দেখে রাফকাত হেসে ফেললো। দুনিয়ার সবকিছু জেনে বসে না থাকতে পারার জন্য সে কিছুটা বিব্রত। বিব্রতভাবটা সুরাইয়া দ্রুত লুকিয়ে ফেললো। দ্রুত লুকিয়ে ফেলার এই কাজটা সুরাইয়া ভালো পারে।

রাফকাত…

হুম?

তুমি তিন মাইল দূরে যেয়ে বসে আছো কেনো?

রাফকাত হেসে বললো,

আমি মোটেও তিন মাইল দূরে বসে নেই। টেনেটুনে তিন ফুট হবে।

তোমার কাছে সেটা আমি জানতে চাই নি। কাছে এসে বসো।

সুরাইয়ার গলায় শাসনের সুর। এই শাসনকে উপেক্ষা করা রাফকাতের কাছে খুব একটা সহজ কাজ না। তবে করতে পারলে এখন অবশ্য একটা জিনিস হবে। সুরাইয়ার অভিমানটা আরেকটু বেড়ে যাবে। সেটা হলে সুরাইয়া কি করে রাফকাতের তা দেখার ইচ্ছে করছে। চোখে বন্ধ করে রেখেও রাফকাত কিভাবে যেনো সুরাইয়ার অভিমানের ব্যাপারটা টের পেয়ে যায়।

রাফকাত সুরাইয়ার কাছে এসে বসলো। পাশাপাশি কাছে বসার একটা অসুবিধা আছে। তখন পাশের জনের দিকে সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকার মানে হারিয়ে ফেলার ভয়। তাই এভাবে যারা বসে, হয় পাশেরজন হারিয়ে গেলে তাদের কিছু আসে-যায় না নতুবা, তারা জানে পাশেরজন কখনও হারিয়ে যাবে না। প্রথম সম্ভবনাটা চোখ বুজে বাদ দেওয়া যায়। রাফকাত সেটা বাদ দিয়ে দ্বিতীয়টাকে ধরলো। এটা নিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। মানুষ হয়ে জন্ম নেয়ার এই এক সমস্যা। জীবনের অনেকটা সময় বিভ্রান্তির মধ্যে থাকতে হয়।

সুরাইয়া, তুমি কি হারিয়ে যাবে?

সুরাইয়া অবাক হয়ে প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন করে ফেললো,

এটা কি ধরণের প্রশ্ন?! হারিয়ে যাবো মানে কি? আমি হারাবো কেন?

পরপর তিনটা প্রশ্ন করে ফেলেছে সুরাইয়া। রাফকাতের প্রশ্ন না বোঝার কারণেই করেছে। এই তিনটা প্রশ্নের উত্তর দেবার দরকার নেই। সুরাইয়া একটু চিন্তা করলে নিজেই রাফকাতের প্রশ্নের মানেটা ধরে ফেলতে পারবে। সে যথেষ্ট বুদ্ধিমতী মেয়ে।

এমনিই জিজ্ঞেস করেছি। তেমন কিছু না, বাদ দাও।

সুরাইয়া ভালো করেই জানে রাফকাত এমনি এমনি প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করে নি। অকারণে অর্থহীন কথা রাফকাত খুব কম বলে, খুবই কম। দিগন্ত থেকে ধীর গতিতে শুভ্র মেঘ ভেসে আসছে। পেঁজা তুলোর মতো শুভ্র মেঘ, শরতের মেঘ। মেঘের সাথে কি মানুষের আবেগের কোন মিল আছে? সুরাইয়া ভেসে বেড়ানো মেঘের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রাফকাতের দিকে তাকালো আর সাথে সাথেই খেয়াল করলো হারিয়ে যাওয়ার মানেটা সে ধরে ফেলেছে।

আমি জানি না, রাফকাত।

হুম, আমিও জানি না। প্রকৃতি মনে হয় সবকিছু আগে-ভাগে জানতে দেয় না। তাই না?

তোমার এইসব কমপ্লিকেটেড কথাবার্তা আমার সাথে বলবা না, বুঝেছো?

কমপ্লিকেটেড কথা বলি নাকি?

হুম, প্যাঁচানো কথা। কথা প্যাঁচানো হলে আমি নিজেও প্যাঁচায়ে যাই। কি বলবো খুঁজে পাই না।

রাফকাত মুখ গম্ভীর করে বললো,

চেইন রি-একশানের মতো, তাই না?

বলেই শব্দ করে হেসে ফেললো। রাফকাতের হাসি শুনে সুরাইয়ার ইচ্ছে হলো ধাক্কা দিয়ে তাকে লেকের পানিতে ফেলে দেয়। বেচারা সাঁতার পারে কি না কে জানে। না জানলে পরে পানিতে পড়ে গেলে ঝামেলা হবে। রাফকাতের কাঁধে হাত দিয়ে তাই আস্তে করে ধাক্কা দিলো সুরাইয়া। রাফকাত হাসতে হাসতে সুরাইয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলো। ধাক্কা দেয়ার সময় সুরাইয়ার মুখের অদ্ভুত হাসিটা তার চোখে পড়ে গেলো। সেই হাসিতে রাগ আছে, আনন্দ আছে আর আছে বিষণ্ণতা। এরকম একটা হাসির জন্য কয়েক সহস্র বছর অপেক্ষা করে কাটিয়ে দেয়া যায়। হায়রে, জীবনটা এতো ছোট কেনো? রাফকাত কি বলবে খুঁজে পাচ্ছে না। কিন্তু সে অবাক হয়ে খেয়াল করছে, মাঝে মাঝে কথা খুঁজে না পাওয়াটা খুব একটা খারাপ না। বিশেষ কোন মানুষের সাথে নীরবতাটাকে উপভোগ করাও আনন্দময় অভিজ্ঞতা। প্রকৃতি মাঝে মাঝে অদ্ভুত আচরণ করে, পৃথিবীর সব শব্দ শুষে নেয়। হঠাৎ করে নেমে আসা নীরবতায় ডানায় ভর করে আকাশে উড়ে বেড়ানো একলা শুভ্র বকটা চমকে ওঠে। হয়তো ভাবে, সবকিছু হঠাৎ এতো শান্ত, নীরব কেনো। নীরবতার কারণ অনুসন্ধানে সে আকাশ ছেড়ে নিচে নামতে শুরু করে। নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে দেখে দু’জন মানুষ চুপচাপ বসে একে অপরের দিকে নিষ্পলক চেয়ে আছে। একে অপরের চোখের গভীরতায় সম্ভবত ডুবে গেছে। তারপর সে ডানা ঝাপটে আবার আকাশের পথে উড়াল দেয়। আকাশে উড়ে বেড়ানো শুভ্র বকগুলো বড্ড একলা হয়।

সময় ব্যাপারটা বড় অদ্ভুত। ফুচকার প্লেট আর কাটা-কাটা কথাবার্তায় বিকেল গড়িয়ে যায়। সেসব কথার মানে রাফকাত আর সুরাইয়া ছাড়া আর কেউ বোঝে না। অর্থহীন কাটা-কাটা কথাবার্তায় সবাই অর্থ খুঁজে পায় না। যারা পায় তারা মুহূর্তগুলোকে ধরে রাখতে জানে। কখন যে সন্ধ্যা নামে রাফকাত খেয়াল করে না। খেয়াল করে নীড়ে ফিরে যাওয়া পাখিগুলো। আর খেয়াল করে সুরাইয়া।

সন্ধ্যা নেমে গেছে। চলো উঠি।

হুম, চলো।

উঠে দাঁড়ায় রাফকাত। উদাস চোখে দূরে কোথাও তাকায়। সুরাইয়া বলে ওঠে,

পিলারের মতো দাঁড়ায়ে আছো কেন? হাত দাও।

রাফকাত মলিন হেসে হাত বাড়ায়। মলিন হাসির বিনিময়ে সুরাইয়ার হাসিটা হলো ঝলমলে। হাত ধরে সুরাইয়াও উঠে দাঁড়ায়। হাঁটতে শুরু করে তারা। আকাশে মাঝারি আকারের একটা চাঁদ থাকার কথা। সেটা নিজের জায়গাতেই আছে। কিন্তু তাকে দেখা যাচ্ছে না। আকাশজোড়া মেঘ, একটুকরো পেঁজা মেঘের আড়ালে চাঁদটা ঢাকা পড়েছে। প্রতি পা এগুনোর সাথে সাথে রাফকাতের মন একটু একটু করে খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এখনো অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। কিন্তু সেটাকে নিতান্তই ছোট মনে হচ্ছে। উদাসভাবে পা ফেলে এগুচ্ছে রাফকাত। উদাস ভাবটা আরেকটু কম হলে সে হয়তো খেয়াল করতে পারতো সুরাইয়া তার হাতটা এখনো ছাড়ে নি। রাফকাতের উদাস মুখের দিকে তাকিয়ে সুরাইয়ার ইচ্ছে করছে তার চুলগুলো এলোমেলো করে আদর করে দিতে। গভীর মমতায় ভাবছে, আহারে! সময়টাকে যদি থামিয়ে দেয়া যেতো!

( অক্টোবর ৬-২৫, ২০১৩ )