কন্টেন্টে যাও

এলোমেলো #৫

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বাজে দিক হচ্ছে একজন শিক্ষার্থীকে একই সাথে দুনিয়ার যাবতীয় জ্ঞান গিলিয়ে দেয়ার চেষ্টা। সর্ববিদ্যাবিশারদ বানাতে গিয়ে পড়াশোনা ব্যাপারটাকে নির্যাতনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একইসাথে হাবিজাবি একগাদা সাবজেক্ট পড়ার চেষ্টা করা মস্তিষ্কের নিদারূণ অপব্যবহার ছাড়া আর কিছুই না। দুঃখজনকভাবে আমাদের চমৎকার শিক্ষাব্যবস্থার কবলে পড়ে স্কুল-কলেজের সব শিক্ষার্থীই এই নিদারূণ অপব্যবহারটা করতে বাধ্য হয়। চমৎকার শিক্ষাব্যবস্থার কাছে তারা মর্মান্তিকভাবে অসহায়।

সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায় প্রায় পাঁচ বছরেরও বেশি সময় থেকেছি। সেখানকারই তিনটা স্কুলে পড়েছি। শেষ যেটায় ছিলাম সেটার নাম “মোমেনা আলী বিজ্ঞান স্কুল”। সেটাই সেখানকার সবচেয়ে ভালো রেজাল্টধারী হাইস্কুল ছিলো। এখন কি অবস্থা তা অবশ্য জানি না। এই স্কুলে ছিলাম দু’বছর, ক্লাস সিক্স আর সেভেন। এই দু’টো বছরই কৃষিশিক্ষা নামক অখাদ্য এক বস্তু গিলতে হয়েছে, অবশ্যই বাধ্য হয়ে। কৃষিশিক্ষা ক্লাস নিতো পাপিয়া ম্যাডাম। এই ম্যাডামের অত্যন্ত প্রিয় কাজ ছিলো পড়া মুখস্ত করতে দেয়া আর পড়া ধরলে বলতে না পারলে শাস্তি দেয়া। প্রতিদিন ক্লাস শেষে হতাশার সাথে পাপিয়া ম্যাডাম হোমওয়ার্ক দেয়া শুনতে হতো। বইয়ের পৃষ্ঠা নম্বর অথবা টপিকের নাম বলে দিতেন, সেখান থেকে খুঁটিনাটি মুখস্ত করে আসতে হতো পরের ক্লাসে। ক্লাসে পড়া ধরতেন, ঠিকঠাক মতো বলতে পারলে রক্ষা, না পারলে শাস্তি। দাঁড়িয়ে থাকা ছিলো কমন শাস্তি, সাথে মার তো থাকতোই। নকশা করা বেত ছিলো, গাঢ় খয়েরি রঙের স্পাইরাল নকশা। ম্যাডাম আয়েশ করে বেতের বাড়ি দিতেন, বাড়ি দিয়ে মনে হয় শান্তি পেতেন মনে। হাত, পিঠ, পশ্চাৎদেশ কোথায় বাড়ি পড়বে সেটার কোন ঠিকঠিকানা ছিলো না, একেকদিন একেক জায়গায়। কোনদিন ক্লাসে বেত আনতে ভুলে গেলে বা হাতের কাছে ঐ বস্তু না পেলে স্কেলের সদ্ব্যবহার করতেন। স্কেলও জোগাড় করতে না পারলে ম্যাডামের নগদ দু’টো হাত তো আছেই। সেই হাতও ছিলো সেইরকম! পিঠের উপর ঘুষি খেলে চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে যেতো। মাথা নিচু করিয়ে পিঠের উপর দুম করে ঘুষি, কিছুক্ষণের জন্য সব ঝাপসা। আর ছিলো স্পেশাল থাপ্পড়। এই স্পেশাল থাপ্পড় মারা হতো দু’হাত দিয়ে একসাথে দু’গালে। দু’দিক থেকে গালের উপর ম্যাডামের দু’হাতের তালু হুঁস করে নেমে আসতো। এই স্পেশাল থাপ্পড়ের স্বাদ এখনো মনে আছে, কান দিয়ে ভাপ ওঠা শুরু করতো। দু’দিন-চারদিন না হয় মার খেয়ে হজম করা যায়, কিন্তু প্রতিদিন তো আর হজম করা সম্ভব না। তাই বাধ্য হয়ে পড়া মুখস্ত করে আসতে হতো। গরু-ছাগল, মুরগি-হাঁসের খাদ্যতালিকা, রোগব্যাধি, কম্পোস্ট সার, সবুজ সারের প্রস্তুতি, এইসব হাবিজাবি মুখস্ত করার মতো পরিহাসের বিষয় আর কিছু আছে কি না কে জানে।

আরেকটা বিরক্তিকর, জঘন্য সাবজেক্ট মুখস্ত করা লাগতো, সমাজবিজ্ঞান। যেই সাবজেক্টের টপ টু বটম শুধু মুখস্তই করা লাগে সেটার জন্য কোন ভালো বিষেশণ ব্যবহার করা রীতিমতো অপরাধ। ক্লাস নিতেন আম্বিয়া ম্যাডাম। ইনি সাক্ষাৎ যমদূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন পড়া না পারলে। ক্লাসে বেত আনতে ভুলে যেতেন এমন খুব কমই হতো। ছাত্রদের পিটিয়ে ইনি পৈশাচিক আনন্দ পেতেন। পিটানোর সময় তাঁকে দাঁত বের করে হাসতে দেখা যেতো। বাধ্য হয়ে এই অখাদ্য সাবজেক্টটাও গিলতে হতো। সমাজবিদ্যা, ভূগোল, পৌরনীতি, অর্থনীতি আরো হাবিজাবি টপিক দিয়ে ভরা সবাজবিজ্ঞান বই। এতো বিদ্যা একজনের পেটে হজম হওয়ার কোনই সম্ভবনা নাই। সবটাই যে বদহজম হয় সেটা বলাই বাহুল্য। পরীক্ষার হলে খাতার উপর কোনমতে বদহজম হওয়া দুর্গন্ধযুক্ত বিদ্যা বের করে দিয়ে আসতে পারলেই ছাত্রছাত্রীদের শান্তি। কোন বিদ্যাই পেটে থাকে না, সময় আর মেধার অপচয় হয় খালি। বিদ্যা যে পেটে রাখার জিনিস না, সেটা অকারণ গিলিয়ে লাভ নেই, এই কথা যারা এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা তৈরির হর্তাকর্তা তারা যে কবে ঠিকমতো বুঝবে কে জানে। যদি কোনদিন বোঝে তখন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা গেলা বাদ দিয়ে শিখতে শুরু করবে। ততোদিন অসহায়ভাবে গিলেই যেতে হবে। হায়রে শিক্ষা! হায়রে শিক্ষার্থী! হায়রে শিক্ষাব্যবস্থা!

এইসব হাবিজাবি অপ্রয়োজনীয় বিষয় মুখস্ত করতে গিয়েই মনে হয় আমার মুখস্ত করার ক্ষমতা সব নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। এখন অবস্থা এমন যে, যেটা মুখস্ত করা প্রয়োজন সেটাও সহজে মুখস্ত করতে পারি না। কিছুই আর মুখস্ত হতে চায় না, বড়ই মুশকিলের ব্যাপার।

( জুলাই ১৬, ২০১৩ )