কন্টেন্টে যাও

কেউ একজন

এক

শহরের কিছু একটা হয়েছে। ইদানিং উদ্ভট সব আচরণ করা শুরু করেছে। সেদিন চায়ের কাপ হাতে পার্কের বেঞ্চে বসে ছিলাম। বিকেল বেলা। প্রচণ্ড গরম পড়েছে। বাতাস বইছে মোটামুটি। কিন্তু সেটাকে জ্বলন্ত উনুন থেকে বেরিয়ে আসা বাতাস বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। জিহ্বা দিয়ে বিরক্তিসূচক একটা শব্দ করে যেই চায়ে প্রথম চুমুক দেয়ার জন্য কাপটা তুলে ধরেছি আচমকা কোথা থেকে যেন কনকনে ঠান্ডা বাতাস ধাক্কা দিয়ে চলে গেলো সবকিছুকে। স্বস্তিতে জমিয়ে রাখা নিঃশ্বাসটা বুক থেকে বের করে দিয়ে কাপ ধরা হাতটা নামিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শ আরেকবার গায়ে লাগিয়ে তারপর আরাম করে চায়ে চুমুক দেয়া যাবে। আশেপাশে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে বোধহয়। গরমটা বড্ড জ্বালাচ্ছে, বৃষ্টিটা হলে একটু শান্তি পাওয়া যেতো। পাশে চায়ের ফ্লাস্ক হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার বিচলিত কন্ঠে জিজ্ঞাসা শোনা গেলো,

“ভাইজান, চা ভালা হয় নাই? ঠান্ডা হইয়া গেছে? আরেক কাপ দিমু?”

ছেলেটার পাশে লাল একটা বালতি রাখা। সেই বালতিতে বেশ কিছু চায়ের কাপ পানিতে ভেজানো। জিহ্বা দিয়ে আরেকবার বিরক্তিসূচক শব্দ করলাম,

“নাহ, মোটেও ভালো হয় নাই। বালতিতে কাপ ভিজায় রাখছিস যেই নোংরা পানিতে, চা বানাইছিস কোথাকার পানি দিয়ে কে জানে।”

“না ভাইজান, চা…”

ছেলেটা কথা শেষ করতে পারলো না, তার আগেই ধমক মারলাম,

“হয়েছে, চুপ কর! ব্যবসায় নতুন?”

“হ।”

“এইসব নোংরা পানিতে কাপ ধোয়া বন্ধ কর। ওয়ান-টাইম গ্লাস ইউজ করবি। চায়ের দাম কত?”

“পাঁচ ট্যাকা।”

হাতে ধরা চায়ের কাপটা সামনে এগিয়ে দিয়ে বললাম,

“ছয় টাকা করবি।”

ছেলেটা কাপটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে চোখ-মুখ কুঁচকিয়ে তাকিয়ে থাকলো। তারপর মৃদু স্বরে বললো,

“হু…”

পকেটে হাত দিয়ে দেখি দশ টাকার একটা নোট ছাড়া কিছু নেই। সেটাকেই বের করে দিয়ে বললাম,

“ভাংতি নাই। পুরাটাই রেখে দে। পরে আরেকদিন চা খাওয়ায়ে যাস।”

ছেলেটা টাকা হাতে নিয়ে বললো,

“আইচ্ছা।”

ছেলেটা আইচ্ছা বলে সরে না যেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ভালো যন্ত্রণা তো। ছেলেটাকে হঠাৎ করেই অসহ্য লাগছে,

আইচ্ছা বলে দাঁড়ায়ে আছিস কেন সামনে? যা ভাগ!”

ছেলেটা লাল বালতি হাতে নিয়ে দাঁত বের করে হাসি দিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। সামনের বা’পাশের দাঁতটা অর্ধেক ভাঙা। ছেলেটা সামনে থেকে সরতেই তৃতীয়বারের মতো বিরক্তসূচক শব্দ করলাম জিহ্বা দিয়ে। ঠান্ডা বাতাস তো এখনো ঘুরে আসেই নি, বরং আগের চাইতেও বাজেভাবে গরম লাগতে শুরু করেছে। নড়েচড়ে বেঞ্চের উপর পা তুলে বসলাম। সন্ধ্যা নামারও বেশ কিছুক্ষণ পর পর্যন্ত চুপচাপ বসে ছিলাম। শেষে গরমের সাথে অনবরত মশার কামড়ও শুরু হওয়াতে উঠে বাসায় চলে আসতে হয়েছিলো সেদিন। ঠান্ডা বাতাসের চিহ্ন পর্যন্তও আর খুঁজে পাওয়া যায় নি। একবার মনে হলো, মনের ভুল নাকি? এইরকম তো হওয়ার কথা না। ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিলো ঠান্ডা বাতাসের ব্যাপারটা সে খেয়াল করেছে নাকি। ছেলেটা সামনে থাকতে জিজ্ঞেস করার কথা মনে পড়ে নি। সামান্য এই ঠান্ডা বাতাসের ঘটনা মনে থাকার কথা না। কিন্তু আমার মনে আছে। কারণ, উদ্ভট ঘটনা আরো ঘটিয়েছে প্রকৃতি। পার্কের ঘটনার দু’দিন পরের কথা। একটা কাজে জুনোর সাথে দেখা করতে উত্তরার ওদিকে গিয়েছিলাম। জুনো হলো পাগলাটে স্বভাবের ছেলে। আমার সন্দেহ তার মাথার বেশিরভাগ নিউরনেই কোন একভাবে শর্ট সার্কিট হয়ে গেছে। তবে বন্ধু হিসেবে জুনো অতি উত্তম পর্যায়ের। আমি খেয়াল করে দেখেছি, বেশিরভাগ পাগলাটে স্বভাবের মানুষগুলো বন্ধু হিসেবে উত্তম পর্যায়ের হয়। তবে ভয়ংকর ধরণের ব্যতিক্রমও যে চোখে পড়ে নি তা অবশ্য না। আমার সাথে জুনোর পরিচয় খুব একটা পুরনো না, বছর চারেক হবে। কলেজ লাইফের ফ্রেন্ড। জুনোর সাথে দেখা হলে সাধারণত যা হয় সেদিনও তাই হলো। কাজের কাজ তো হলোই না, উল্টো ভর দুপুরে আবিষ্কার করলাম লেকের পাড়ে ফুটপাতে পা মেলিয়ে বসে আছি জুনোর সাথে। জুনোর পরিচিত কোন এক পিচ্চি ছেলেও ছিলো সঙ্গে। টেনেটুনে আট বছর হয়তো বয়স হবে। পরনে সবুজ রঙের একটা টি-শার্ট আর নিচের দিকে ছিঁড়ে সুতো বের হয়ে যাওয়া একটা হাফপ্যান্ট। মাথা থেকে শুরু করে পায়ের বুড়ো আঙুল পর্যন্ত ধুলোয় মাখামাখি। আমাকে দেখেই সবগুলা দাঁত বের করে মাটিতে পা ঠুকে পুলিশি কায়দায় স্যালুট দিয়ে সালাম,

”‘সালামুয়ালাইকুম ভাইজান।”

আমি একপাশের ভ্রু উঁচিয়ে জুনোর দিকে তাকালাম। জুনো আরো বড় করে হাসি দিয়ে বললো,

“রাফকাত, একে চিনে রাখ। এ হচ্ছে গিয়ে শাহজাহান। সেইরকম গানের গলা।”

তারপর শাহজাহানের দিকে তাকিয়ে বললো,

“তুই বস তো। গান ধর একটা।”

শাহজাহান সাথে সাথে বসে পড়ে গান শুরু করে দিলো,

ওরে নীল দরিয়া
আমায় দে রে দে ছাড়িয়া

জুনোর কথা সত্যি। আট বছরের একটা ছেলে এমন গলায় গান গাইতে পারে আমার ধারণায় ছিলো না। জুনো চোখ বন্ধ করে গানের সাথে সাথে মাথা দোলাচ্ছে। গানের গলা শুনে আমার একবার সন্দেহ হলো শাহজাহানের বয়স নিয়ে, কিন্তু তারপর সেসব ভুলে গিয়ে ভর দুপুরের গরমের মাঝে আমিও গানের মধ্যে ডুবে গেলাম একসময়। আমরা যেখানে বসে আছি ঠিক তার পাশেই একটা বেশ বড়সড় গাছ, প্রায় গোড়া থেকেই বেঁকে গিয়ে লেকের পানির উপর ঝুঁকে পড়েছে। সারা গাছ জুড়ে হালকা বেগুনী রঙয়ের ফুল ভর্তি। কি গাছ এটা কে জানে। গাছটার দিকে তাকিয়ে কি যেন চিন্তা করতে শুরু করেছিলাম এমন সময় হুট করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো, একদম ঝুম বৃষ্টি যাকে বলে। জুনো আর শাহজাহান সাথে সাথে লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। আমি উঠে ঝেড়ে দৌড় দিয়ে আশেপাশের কোনকিছুর নিচে যেয়ে দাঁড়াবো নাকি কিছু না করে বসেই থাকবো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই আবার হুট করে সব শান্তও হয়ে গেলো। কোথায় বৃষ্টি আর কোথায় কি! শাহজাহান বিড়বিড় করে বৃষ্টিকে মাঝারি পর্যায়ের একটা গালি দিয়ে বললো,

“সবকিছুর মাথার তার ছিঁড়া আইজকাল।”

জুনো আমার দিকে তাকিয়ে মুখে হাসি নিয়ে উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে বললো,

“দেখেছিস অবস্থা! উপর দিয়ে প্লেন গেছে মনে হয়, টয়লেটের টাংকি ক্লিয়ার করে দিয়ে গেলো!”

দুই

বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। ঝুম বৃষ্টি। ভোরবেলা থেকে শুরু হয়েছে। আমি অবশ্য দেখি নি। আম্মুর কাছে শোনা। আমি ঘুম থেকে উঠেছি প্রায় দুপুর বেলা। তখন বৃষ্টি এতো জোরে ছিলো না। যতই সময় যাচ্ছে বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। কাঁথা মুড়ি দিয়ে জানালার পাশে বসে আছি। কাঁথা থেকে ন্যাপথালিনের উৎকট গন্ধ এসে নাকে লাগছে। প্রথমদিকে অস্বস্তি লাগছিলো। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর এখন আর খুব একটা খারাপ লাগছে না, সয়ে গেছে। প্রায় ঘন্টা চারেক হবে এভাবে বসে আছি চুপচাপ। গতকালও অস্বস্তিকর গরম ছিলো, এখন চারপাশে সব ঠাণ্ডা। বৃষ্টির বেগ বেড়েই চলেছে। হুট করে থেমে যাবে বলেও মনে হচ্ছে না। এরকমভাবে চলতে থাকলে রাস্তায় পানি জমে যাবে। এতোক্ষণে কোন পর্যন্ত জমেছে কে জানে। আরেকটু সামনে ঝুঁকে জানলা দিয়ে নিচের দিকে তাকালেই রাস্তা দেখা যাবে। দেখতে ইচ্ছে করছে না। কি দরকার। বাইরে যাওয়া দরকার ছিলো। একজনের সাথে দেখা করার কথা ছিলো আজকে বিকালে। বিকাল বিদায় নিয়েছে ইতোমধ্যে। খুব সম্ভবত সন্ধ্যা নেমেছে। বোঝা যাচ্ছে না। আকাশ মেঘে ঢাকা। দুপুরবেলাকেও সন্ধ্যা মনে হয় এরকম ঝুম বৃষ্টির দিনে। সময়টা জানতে পারলে হতো। রাজ্যের আলস্য ভর করেছে শরীরে। হাত বাড়িয়ে পাশে বিছানার উপর পড়ে থাকা মোবাইলটাকে ধরতেও ইচ্ছে করছে না। সুরাইয়া দেখা করতে এসেছিলো কি না এই বৃষ্টির মধ্যে কে জানে। আসতেও পারে। এই মেয়েটাকে এখনো পর্যন্ত বুঝতে পারা দায়। কল করে জিজ্ঞেস করা দরকার এসেছিলো কি না। কেউ এসে মোবাইলটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেলে ভালো হতো।

“রাফকাত!”

আম্মু ডাকছে। ওঠাই লাগবে এবার। তাছাড়া আলস্যকে এতো পাত্তা দেয়াও ঠিক হচ্ছে না। পাশ থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। গলা উঁচু করে সাড়া দিলাম,

“কি?”

“এদিকে আয়। কে যেন একটা ছেলে এসেছে তোর কাছে।”

এমন সময় কে আসতে পারে? এই ঝুম বৃষ্টির মধ্যে আমার সাথে দেখা করতে আসার মতো পাগল একজনই আছে, জুনো। জুনো আসে নি। আম্মু জুনোকে চেনে। ভাবতে ভাবতেই দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম। অপরিচিত একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। সাদা রঙের একটা টিশার্ট গায়ে। নিচে হাফ ডজন পকেটওয়ালা একটা প্যান্ট, হাঁটুর নিচ পর্যন্ত মোড়ানো। সেমি-ট্রান্সপারেন্ট একটা রেইনকোট চাপানো গায়ে। রেইনকোটের হুড মাথা থেকে ফেলে চুলে আঙুল ঢুকিয়ে পানি ঝাড়ছিলো ছেলেটা, রেইনকোট খুব একটা কাজে দেয় নি মনে হয়, আমাকে দেখে ভদ্রতার একটা হাসি দিলো। আমার থেকে ছেলেটা বয়সে ছোট, সম্ভবত স্কুল পড়ুয়া, অথবা সদ্য কলেজে উঠেছে। আমি হাসি ফেরত দিয়ে বললাম,

“তোমাকে তো চিনলাম না!”

ছেলেটা আরেকবার হাসলো। কিছু না বলে রেইনকোটের চেইন খুলে প্যান্টের পাশে একটা পকেট থেকে পলিথিনে মোড়ানো একটা প্যাকেট বের করে আনলো। পলিথিনের প্যাকেট থেকে বের হলো কাগজে মোড়ানো চারকোণা একটা বস্তু, সম্ভবত বই। সেটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,

“এটা আপনার জন্য।”

“আমার জন্য মানে? কে দিয়েছে?”

আমি সেটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে বললাম।

“আমার কাজ ছিলো এটা আপনার হাতে পৌঁছে দেয়া। ভালো থাকবেন, শুভ সন্ধ্যা।”

ছেলেটা আরেকটা হাসি দিয়ে রেইনকোটের চেইন টানতে টানতে দ্রুত ঘুরে সিড়ি দিয়ে নামা শুরু করেছে।

“আরে, দাঁড়াও! নাম কি তোমার?”

আমার প্রশ্ন হয় ছেলেটার কানে ঢোকে নি, নতুবা শুনেও ইচ্ছে করে থামে নি। আরেকবার চিল্লিয়ে ডাকতে গিয়েও থেমে গেলাম, ডেকে লাভ নেই বুঝে গেছি। ছেলেটা পরিচয় দিতে আগ্রহী না অথবা যে তাকে পাঠিয়েছে সে হয়তো নিষেধ করে দিয়েছে কিছু বলতে। যেইটাই হোক, আর ডাক দেয়া অর্থহীন। বৃষ্টির সাথে বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করেছে বাইরে। দরজা বন্ধ করে আমি আমার আগের অবস্থানে ফেরত আসলাম। বাইরে সবকিছু হুট-হাট দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। তারপরেই বিকট শব্দের গর্জন। বেশিরভাগ মানুষ মনে করে গর্জনটা মেঘের, এক মেঘের সাথে আরেক মেঘের ঘর্ষনের শব্দ। ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও সেটা না। সোজাসাপটাভাবে বলতে গেলে বলা যায়, গর্জনটা হলো বাতাসের। বজ্রপাতের সময় তাপে বাতাস হঠাৎ করে প্রচণ্ড গতিতে প্রসারিত হতে শুরু করায় বিকট শব্দের সৃষ্টি হয়। খুব মনযোগ দিয়ে ব্যাপারটা কল্পনা করতে চেষ্টা করছিলাম। হাতের মুঠোতে ধরা মোবাইলটা কেঁপে ওঠায় চমকে উঠলাম। সুরাইয়া কল করেছে। কল রিসিভ করে সুরাইয়াকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আমি কথা শুরু করলাম,

“সুরাইয়া, কই তুমি? সেই বিকাল থেকে দাঁড়ায়ে আছি তোমার জন্য। ভিজে-টিজে তো অবস্থা খারাপ একদম। কাকভেজা বললে পোষায় না, এমন অবস্থা যে বকভেজা বলা লাগে। কল করে অন্তত একবার জানাতে পারতা যে আসবা না।”

বলতে বলতে আমি জানালার দিকে আরেকটু এগিয়ে গেলাম। বৃষ্টি এখনো মুষলধারে পড়ছে, একঘেয়ে জলের শব্দ হয়েই যাচ্ছে। দু’সেকেন্ড নীরবতা, তারপর বীপ শব্দ করে কল কেটে গেলো। আমি ঢোক গিলে মোবাইলের কল রেকর্ড চেক করলাম। সুরাইয়ার ডজনখানেক মিসকল এসে রয়েছে। সেই বিকাল থেকে শুরু হয়েছে। ছোটবেলায় টম এণ্ড জেরি কার্টুন দেখতাম। সেই কার্টুনের দুনিয়ায় হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার নিয়ম ছিলো। টম, জেরি এরা ইচ্ছে হলেই ঠুস করে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারতো। আমি ঠুস করে হাওয়ার মিলিয়ে যাওয়ার ইচ্ছেটাকে জোর করে চাপা দিলাম। ইনবক্সে দু’টো টেক্সট ম্যাসেজ এসে বসে রয়েছে। লম্বা দম নিয়ে ইনবক্সে ঢুকলাম। একটা ম্যাসেজ মোবাইল নেটওয়ার্ক ক্যারিয়ারের কাছ থেকে আসা। অন্যটা সুরাইয়ার,

“প্রচণ্ড বৃষ্টি বাইরে। আজকে আর বের হতে পারবো না।”

ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো আমার। এই বৃষ্টির মধ্যে সুরাইয়া যেয়ে একা একা দাঁড়িয়ে থাকলে বিতিকিচ্ছিরি একটা ব্যাপার হয়ে যেতো। আপাতত এই ব্যাপার নিয়ে আর চিন্তা না করি। কোনকিছু নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করলে সেটাতে গুবলেট পাকানোর সম্ভবনা বেড়ে যায়। পরে কল দিয়ে সরি-টরি বলা যাবে। এখন বরং কাগজে মোড়ানো চারকোণা বস্তুটাতে মনযোগ দেয়া যাক। কাগজটা বেশ পুরু, খসখসে, হালকা ধূসর বর্ণের। আগেও দেখেছি, তবুও আরেকবার উল্টেপাল্টে দেখলাম পুরো জিনিসটা। কোথাও কিছু লেখা নেই। কাগজের কিনারাগুলোতে লাগানো স্কচটেপের টুকরাগুলোকে সাবধানে খুলে ফেললাম। কাগজের ভেতরের দিকটা গাঢ় নীল বর্ণের। ভেতরে বই একটা, হুমায়ূন আহমেদের “রোদনভরা এ বসন্ত”। বইয়ের প্রত্যেকটা পৃষ্ঠা একে একে উল্টে দেখলাম, কোথাও কলমের কোন আঁচড় নেই। কে আমাকে বইটা দিলো, কি জন্য দিলো, কোনকিছুরই কোন উল্লেখ নেই। যতটুকু আগ্রহ নিয়ে এতক্ষণ বইটা ধরে ছিলাম সেটা এক ধাক্কায় অনেকখানি কমে গেলো। বিছানার এক কোণায় সেটাকে ছুঁড়ে ফেলে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালাম। হুবহু এই বইটাই বহু বুকস্টোরে পড়ে আছে। কলমের কালি দিয়ে দু’একটা আঁচড় দিলেই এটা সেই বইগুলো থেকে আলাদা হতে পারতো। শুধু শুধু বই কিনেই কাউকে সেটা গিফট করে দেয়ার তো কোন মানে নেই। সাড়ে আটটা বেজে গেছে প্রায়। ক্ষুধা লেগেছে। আম্মু কোথায় আছে কে জানে।

“আম্মু!”

পরপর দু’বার বিকট আওয়াজ হলো। প্রথমটা বজ্রপাতের। খুব কাছেই কোথাও বজ্রপাত হয়েছে। দ্বিতীয়টা এলাকার বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মার ব্লাস্ট হওয়ার। নিমেষেই সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেলো। ব্যাকাপ জেনারেটর চালু হয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। তবে আজকে রাতে আর ইলেক্ট্রিসিটি ফেরত আসার কোন সম্ভবনা নেই। জেনারেটরও বেশিক্ষণ চলবে না। আজকে রাতটা মুঠোফোনের।

তিন

বৃষ্টি থামে নি। এতো লম্বা সময় ধরে বৃষ্টি হতে দেখি নি বহুদিন। সকাল এগারোটা বাজে। গতকাল ভোরবেলা থেকে সেই যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে এখনো থামে নি। বাসার আশেপাশের রাস্তাগুলোতে হাঁটুপানি। এরকম আরো দিন চারেক চলতে থাকলে নির্ঘাত নৌকা নেমে যাবে রাজপথে। ছোটবেলায় দেখেছি থামাথামি ছাড়া দিনের পর দিন বৃষ্টি হতে। তবে এই শহরে না, মফস্বলে। চারদিন-পাঁচদিন, কোন থামাথামি ছাড়া বৃষ্টি ঝরেই যাচ্ছে। বৃষ্টির কারণে স্কুলে ক্লাস বন্ধ। বৃষ্টি উপলক্ষ্যে বাসায় খিচুড়ী রাঁধা হতো। ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ী, সাথে মুরগীর মাংস। ফ্রিজ থেকে বের করা ঠাণ্ডা শসা। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর অলস সময়। বাসার দরজা-জানালা সব বন্ধ। বন্ধ দরজা-জানালা এপাশ থেকে বৃষ্টির একঘেয়ে একটানা শব্দ শোনা যেতো। সেই একঘেয়ে একটানা শব্দে কান পেতে বসে থাকতাম। কোথা থেকে যেন চোখে রাজ্যের ঘুম এসে নামতো। জানালার কাঁচগুলোয় বাষ্প জমে ঘোলা হওয়া দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়তাম। ঘুমের ভেতর কোন একসময় আম্মু এসে গায়ের উপর কাঁথা বিছিয়ে দিয়ে যেতো। মফস্বলের সেসব দিনে থামাথামি ছাড়া বৃষ্টিকে কখনো অস্বাভাবিক মনে হয় নি। জনবহুল এই শহরে সেটাকেই বড্ড বেমানান ঠেকছে। বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। সামনের রাস্তায় গোটা পাঁচেক ছেলেপিলে ফুটবল নিয়ে পানিতে নেমে পড়েছে। পানি যথেষ্ট নোংরা। আশেপাশের সব ড্রেইনের ময়লা-আবর্জনা বৃষ্টির পানির সাথে উঠে এসেছে। সেটা নিয়ে তাদের খুব একটা মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। তাদের প্রত্যেকের মুখেই হাসি লেগে আছে। এদের কারো বাসাই চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা এসব দালানকোঠায় না। কোন বস্তিতে চটের বস্তা টানিয়ে বানানো তাঁবুতে হয়তো এরা থাকে। এদের মধ্যে কারো বাবার হয়তো কোন খোঁজ নেই অথবা হয়তো এই বৃষ্টির মধ্যেও রাস্তায় রাস্তায় রিকশা টেনে বেড়াচ্ছে। কারো মা হয়তো বাসা-বাড়িতে বুয়ার কাজ করে বেড়াচ্ছে। কে জানে, হাসিমুখে ফুটবল নিয়ে লাফালাফি করে ক্ষুধা নিয়ে বাসায় যেয়ে এদের মধ্যেই কেউ হয়তো দেখবে খাওয়ার কিছু নেই। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে জুনোকে কল দিলাম। প্রায় সাথে সাথেই জুনো কল রিসিভ করলো,

“আজিব! আমি কি সেইটা বলেছি নাকি!”

ব্যাপার কি! আমি তো কিছু বললামই না। আমার মুখ খোলার আগেই আবার জুনোর কথা শোনা গেলো,

“রাগ করো কেন বাবু? দেখো…”

মাঝপথে এসে থেমে গেলো জুনো। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে এবার আমার উদ্দেশ্যে বললো,

“হ্যালো, রাফকাত। আছিস?”

“তুই আমার কল রিসিভ করে কথা বলিস কোন বাবুর সাথে?”

“মাথা-টাথা ঠিক নাই রে! একটা মেয়ের কথা বলেছিলাম না, মিরপুরে থাকে? তার সাথে।”

“কোন মেয়ে? নিশিতা?”

“নিশিতা তো উত্তরায় থাকতো…”

আমার হাসি শুনে জুনো থেমে গেলো। আমি হাসি থামানোর চেষ্টা করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম,

“তাইলে এই বাবুটা কোনটা?”

আমার প্রশ্নের উত্তর দিলো না জুনো,

“হাসিস না, রাফকাত। বড় যন্ত্রনায় আছি। হিউমরলেস কোন মেয়ের সাথে সম্পর্ক থাকার চেয়ে সারাজীবন একা থাকাও ভালো। আমার মাঝে মাঝে ভয় হয় কি জানিস? বাসর রাতে…”

“থাম, তোর বাসর রাতের ভয়ের কাহিনী পরে বলিস। তুই আছিস কই? এইদিকে আসতে পারবি একটু?”

“এইদিকে মানে কোনদিকে? মিরপুর? মিরপুরের কাছাকাছিই আছি।”

“এই বৃষ্টির মধ্যে মিরপুর কাছাকাছি কি করিস?!”

জুনো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,

“রুবার সাথে দেখা করার জন্য আসছিলাম।”

আমি হাসি চেপে রেখে গম্ভীরস্বরে বললাম,

“হিউমরলেস রুবা বাবু? পরে দেখা করিস। হিউমরলেস কোন মেয়ের সাথে সম্পর্ক থাকার চেয়ে সারাজীবন একা থাকাও ভালো। দ্রুত চলে আয়, কাজ আছে।”

“হু। এই মেয়ের যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না। সেইদিন…”

আমি কান থেকে মোবাইল নামিয়ে পকেটে ভরলাম। হিউমরলেস রুবা বাবুর কাহিনী শোনার কোন মানে হয় না। সুরাইয়াকে কল করতে ইচ্ছে করছে। ঠিক করে বললে, সুরাইয়ার কথা শুনতে ইচ্ছে করছে। অথচ এইতো রাত্রেই দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছে। লিভিংরুমে চলে এসে টিভি অন করলাম। বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর আর বাসা থেকে বের হওয়া হয় নি। রাজপথে পানি উঠলো নাকি খোঁজ নেয়া দরকার। রাজপথের অবস্থা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হলো না। সংবাদ পড়তে দু’জন বসে আছে, পেছনে স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল। সংবাদপাঠক পাঞ্জাবি আর সংবাদপাঠিকা শাড়ি পরে আছে, দু’টোর রঙই ধবধবে সাদা। বেশ কায়দা করে ক্যামেরা ধরা হয়েছে, কাঁচের দেয়ালের ভেতর দিয়ে নিচের রাজপথ দেখা যাচ্ছে। পানি ওঠেনি, গাড়ির সারি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টির বেগ এখানকার থেকে অনেক কম। কাঁচের দেয়ালের গা বেয়ে বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ছে। এরা দু’জন এই চমৎকার পরিবেশে বসে সংবাদ পড়ছে কেন কে জানে। এদের উচিত ছিলো মৃদু শব্দে রবীন্দ্রসংগীত ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকা।

দারোয়ান কাকাকে জুনো আসলে ছাদে পাঠিয়ে দিতে বলে ছাদে চলে আসলাম। বিভিন্ন রকমের গাছপালা দিয়ে ভর্তি ছাদটা। পাতাগুলো সব চকচক করছে। প্রচণ্ড গরমের পর টানা বৃষ্টিতে সতেজ হয়ে উঠেছে গাছগুলো। মজার ব্যাপার হচ্ছে বিশাল এক ড্রামের মধ্যে রীতিমত কদম গাছ আছে একটা। গত বর্ষায় গাছ ভর্তি কদমফুল হয়েছিলো। কদম গাছের দিকে চোখ পড়তেই মনে হলো কয়েকটা কদমফুল জোগাড় করতে পারলে খারাপ হতো না। জুনো চলে এসেছে। আমাকে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাতের ছাতাটা আর মোবাইল সিড়িঘরে রেখে নির্বিকারভাবে হেঁটে এসে আমার পাশে দাঁড়ালো।

“জুনো।”

“কি ব্যাপার?”

“এখন কি মাস রে?”

“মে, বৈশাখ… আরবী মাস জানি না।”

“কদমফুল দরকার।”

“অপেক্ষা করতে থাক। এ’খানেই তো কদম গাছ আছে।”

“এখন দরকার, দু’একদিনের মধ্যে।”

“অসুবিধা নাই। এখনই ফোন লাগিয়ে অর্ডার দিচ্ছি। শুধু কদমফুল কেন, ডুমুরের ফুলসহ হাজির হয়ে যাবে।”

আমি আড়চোখে জুনোর দিকে তাকালাম। আমার কথা মোটেও সিরিয়াসলি নেয় নি সে, মুখ বাঁকা করে নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। রাস্তায় এখনো ফুটবল খেলা চলছে। জুনোকে জিজ্ঞেস করলাম,

“কতক্ষণ ফ্রি আছিস তুই?”

“আছি বহুক্ষণ। রুবার ঝামেলা তো আর নাই। বেকুব মেয়ে সামান্য একটা জোকও বোঝে না! প্রত্যেকটা কথাকে টেনে-হাঁচড়ে…”

“বেকুব মেয়ের কথা বাদ দে। মহৎ কর্ম সম্পাদন করতে হবে, নিচে চল।”

জুনো সবগুলো দাঁত বের করে আগ্রহসহকারে বললো,

“আয় লাফ দেই!”

আমি জুনোর কথায় কান না দিয়ে দ্রুতপায়ে সিড়িঘরে চলে আসলাম। মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখি সুরাইয়ার ম্যাসেজ এসেছে,

“মর্নিং”

ছোট্ট ম্যাসেজ। আমিও ছোট্ট করেই রিপ্লাই দিলাম,

“বৃষ্টি”

দ্রুত পায়ে নিচে চলে আসলাম। ছেলেপিলেগুলোকে নিয়ে কোথাও বসে খাওয়াদাওয়া করা লাগবে। রাজপথে পানি উঠলে নৌকা নিয়ে ঘুরাঘুরি করার ইচ্ছে ছিলো। সেটা আর করা হবে না। এইসব ব্যাপার জুনো ভালো ম্যানেজ করতে পারে। জুনোকে বললাম মহৎ কর্মের কথা। সব শুনে জুনো বললো,

“চল। আমারও খিদা লেগেছে। সকালে নাস্তা করারও সময় পাই নাই। রুবার সাথে দেখা করার জন্য ঘুম থেকে উঠেই দৌড়। এই বৃষ্টির মধ্যে কষ্ট করে আসছি, এর মধ্যেই মোবাইলে ক্যাঁচাল শুরু করে দিলো…”

আবার রুবা বাবুর কথা শুরু হয়েছে। যতক্ষণ সাথে থাকবো কিছুক্ষণ পরপরই জুনো রুবা বাবুর কথা তুলবে। থামিয়েও লাভ হবে না। মাস দুয়েক আগেই নাতাশাকে নিয়ে এরকম প্যাঁচাল শোনা লেগেছিলো। নাতাশা নাকি ফেসবুকে জুনোর সাথে জুনোর চাচাতো বোনের ছবি দেখে কেঁদে-কেটে, ঝগড়া করে হুলুস্থুল কান্ড বাঁধিয়ে ফেলেছিলো। জুনোর ভাষায় “এরকম স্টুপিডলি-ওভারপ্রটেক্টিভ ব্রেইনলেস মেয়ের সাথে সম্পর্ক থাকার চেয়ে সারাজীবন একা থাকাও ভালো।” আমি প্যান্টের পা ভাঁজ করে উপরে তুলতে তুলতে লম্বা করে শ্বাস নিলাম। দীর্ঘক্ষণ রুবা বাবুকে নিয়ে প্যাঁচাল শুনতে হবে। পেছনে ফিরে জুনোর দিকে তাকিয়ে রাস্তার নোংরা পানিতে পা ডুবালাম।

চার

সকাল ১১:২৮

“মর্নিং”

সকাল ১১:৪২

“বৃষ্টি”

“বৃষ্টি কি?”

“বাইরে দেখেছো কি অবস্থা?”

“দেখেছি। ছাদে উঠছি এখন, ভিজবো”

“একটু ওয়েট করো, আমি আসছি”

“কোন দরকার নেই”

“রুড!”

দুপুর ০১:১৭

“কই তুমি? করো কি?”

“ফুটপাতে বসে বৃষ্টি খাই”

“মানে কি?”

“জুনোও বৃষ্টি খাচ্ছে। সাথে রতন, মনির, শরিফ, আকবর, সাইফুরও আছে”

“কারা এরা?”

“রোকেয়া সরণিতে অটোবির সামনে বসে আছি সবাই। চলে এসো, সবার সাথে পরিচয় করে দেই”

“পাগল কোথাকার…”

“মোবাইল ভিজে শেষ। ঠিকমতো টাইপ করা যাচ্ছে না। পরে পাগলামি করি…”

দুপুর ০৩:৫৮

“আছো?”

“বৃষ্টি খাওয়া শেষ?”

“শেষ। বেশি খেয়ে ফেলেছি। মাথাব্যথা শুরু করেছে”

“জুনায়েদের কি অবস্থা? আর মনির, শরিফ এরা কারা ছিলো?”

“জুনো হাঁচি দিতে দিতে বাসার দিকে রওনা দিয়েছে। আর এরা হলো স্বনামধন্য ফুটবলার। আমি আর জুনো দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করার জন্য সাথে কাউকে পাচ্ছিলাম না দেখে বাসার সামনের রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গেছিলাম এদের…”

“বুঝলাম। ওষুধ খেয়ে ঘুম দাও”

“ওকে। নাইট”

“গুড নাইট”

সন্ধ্যা ০৭:২০

“মর্নিং”

“মাথা ব্যথা কমেছে?”

“কমেছে। সুরাইয়া…”

“কি?”

“কল দেই?”

সন্ধ্যা ০৭:৩৩

“নাহ”

“আচ্ছা”

সন্ধ্যা ০৭:৪০

ঘর অন্ধকার করে শুয়ে রয়েছি। বাইরে বৃষ্টির সাথে ঝড়ো বাতাস যোগ হয়েছে। জানালার পাশে দাঁড়ানো গাছটা অবিরাম দুলছে। বৃষ্টির একঘেয়ে শব্দের সাথে গাছের পাতার খসখস শব্দ মিলেমিশে একাকার। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরের ল্যাম্পপোস্টের মৃদু আলো ঘরের দেয়ালে এসে পড়ছে। মৃদু আলোয় ছায়া-আবছায়ার লুকোচুরি পুরো দেয়াল জুড়ে। মোবাইলটা কাঁপতে শুরু করেছে। আমি মোবাইলের স্ক্রিণের দিকে না তাকিয়েই কল রিসিভ করে কানে ধরলাম।

পাঁচ

“কি অদ্ভুত সময়। তাই না?”

মেয়েটার গলার স্বরে বাচ্চা বাচ্চা ভাব আছে। এই মাত্র এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। বেগুনী রঙের একটা শার্ট আর জিনস পরা। আগে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। আমি কিছু না বলে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসি দিলাম। হাসি দিয়ে বুঝাতে চাচ্ছিলাম যে আমি এখন কথা বলতে আগ্রহী না।

“এখানে দাঁড়িয়ে আছেন যে একা একা?”

স্পষ্টতই বুঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। মেয়েটার কথা বলা বন্ধ হয় নি। যতটা গম্ভীর মুখে কারো দিকে তাকানো যায় মুখে ততটা গম্ভীর ভাব ফুটাতে চেষ্টা করে মেয়েটার দিকে আবার তাকালাম। বড়ই খারাপ সময় চলছে। মাসখানেক আগের ঘটনা। বিকালে গড়িয়ে সন্ধ্যে নামছে। বনানী বিদ্যানিকেতনের ওদিকে কোন এক টঙে দাঁড়িয়ে সিফাত চা খাচ্ছিলো। সালোয়ার-কামিজ পরা ভদ্রগোছের এক তরূণী কোথা থেকে এসে বললো,

“আরে, সিফাত ভাই না? ওমা! এতোদিন পরে দেখা! আমাকে চিনেছেন?”

ঘটনার শেষটায় সিফাতের লাভের খাতায় যোগ হয়েছিলো নতুন একটা অভিজ্ঞতা। আর সেই মেয়ে আর অন্ধগলিতে দাঁড়িয়ে থাকা তার দুই সঙ্গীর লাভ একটা হাতঘড়ি, নতুন একটা সনি স্মার্টফোন, একটা নোকিয়া আনস্মার্টফোন, মানিব্যাগের হাজারতিনেক টাকা, ক্রেডিট কার্ড, আরও হাবিজাবি কি সব। মেয়েটার সঙ্গীদের হাতে চাকু দেখে সিফাত ভড়কে গিয়ে আগ বাড়িয়ে ক্রেডিট কার্ডের পিন নম্বরও বলে দিয়েছে,

“প্লিজ, শান্ত হন। মানিব্যাগে দু’টো ক্রেডিট কার্ড আছে। ওগুলোর পিন হচ্ছে…”

তারা শান্ত হয়ে খালি মানিব্যাগটা সিফাতের হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেছে। সিফাতের জন্য অবশ্য এটা তেমন কোন ব্যাপার না। সিফাতের বাবা বিরাট বড়লোক গোছের মানুষ। আমার গম্ভীর মুখে কাজ হয় নি। গম্ভীর মুখ দেখে মেয়েটা হেসে ফেলেছে,

“আমাকে চিনতে পারছেন না। এভাবে ভুলে যাওয়া কিন্তু ঠিক না, ভাইয়া!”

মেয়েটার দাঁতগুলো সুন্দর, হাসিটাও। আমি সেদিকে তাকিয়ে না থেকে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটার দিকে তাকালাম। সেখান থেকে হঠাৎ চাকু কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র ধরণের কিছু বের হলে উল্টো ঘুরে দৌড় দেয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত আমি। মেয়েটা চতুর্থবারের মতো মুখ খুললো,

“এভাবে ভ্রু-কপাল কুঁচকে ভাবছেন কি? আমি রিতু।”

“কোন রিতু?”

“আপনি আসলেই ভুলে গেছেন! আমি ভাবছিলাম ফাজলামি করছেন।”

মেয়েটার মুখে অপ্রস্তুতভাব ফুটে উঠেছে। ছিনতাইকারী গ্রুপের মেয়েরা অভিনয় ভালো করতে পারে। ভালো অভিনয় করতে না পারলে শিকার টোপ গিলবে কিভাবে? তবে এই রিতুকে অবশ্য এখন আর সেরকম কিছু বলে মনে হচ্ছে না। এখনো চুপ করে থাকা অভদ্রতার পর্যায়ে পড়ে,

“আমি দুঃখিত, রিতু। আপনাকে চিনতে পারছি না। আমার স্মরণশক্তি দুর্বল।”

রিতু অপ্রস্তুতভাব কাটিয়ে উঠেছে।

“আপনি কদমফুল খুঁজছেন?”

আমি কদমফুল খুঁজছি জুনো ছাড়া আর কারো জানার কথা না। নিশ্চয় জুনোর কাছ থেকে শুনেছে এই মেয়ে। এই রিতুটা কে জুনোকে জিজ্ঞেস করতে হবে মনে করে।

“না তো। এই জৈষ্ঠ মাসে কোন পাগলে কদম খোঁজে?”

রিতু আবার হাসা শুরু করেছে, দাঁতগুলো সুন্দর। এতোকিছু বাদ দিয়ে দাঁতের কথা বারবার মাথায় আসছে কেন বুঝছি না। মাথায় যখন আসছে বলে ফেলা দরকার,

“আপনার দাঁতগুলো সুন্দর।”

“আপনার বন্ধু জুনোর মুখে অনেকবার শুনেছি এই কথা।”

এতোক্ষণে মনে পড়েছে রিতুর কথা। জুনোর সাথে রিতুর রিলেশান ছিলো দীর্ঘদিন, প্রায় বছরখানেক, এতো লম্বা সময় অন্য কারো সাথে টেকে নি জুনো। রিতু আমাকে চেনে কারণ রিলেশানটা শুরু হওয়ার পেছনে আমার বিশেষ ভূমিকা ছিলো। রিতুর সাথে ব্রেকাপ হওয়ার পর জুনোর উপর বিরক্ত হয়েছিলাম খুব। সেই রিতুকে কিভাবে ভুলে গেলাম বুঝতে পারছি না। রিতু কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা থেকে মোবাইল বের করলো। সময় দেখলো মনে হয়, বললো,

“আমাকে চিনতে পেরেছেন?”

আমি ছোট করে উত্তর দিলাম,

“হুমম…”

“আমার মোবাইল নাম্বারটা রাখুন। কদমফুল লাগলে কল দিবেন। আর এখন জৈষ্ঠ মাস না, বৈশাখের শেষ।”

আমি মোবাইলে রিতুর নাম্বারটা সেভ করলাম। ওভারব্রিজের রেলিংয়ের উপর কনুইয়ে ভর দিয়ে রিতু কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। বৃষ্টির বেগ বেশ কমে গেছে আজকে। আকাশের কান্না বোধহয় ধরে এসেছে। আমি নীরবতা ভাঙলাম,

“জুনোর সাথে কথা হয় এখনো?”

রিতু হাসলো, এবারের হাসিটা আগেরবারের থেকে মলিন, বললো,

“হয়, কখনো-সখনো। উদ্ভট সব কথা বলে আপনার বন্ধু।”

“আমি দুঃখিত, রিতু।”

“আপনার করার কিছু ছিলো না। আসি, ভাইয়া। ভালো থাকবেন।”

“তুমিও ভালো থেকো।”

কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে বেগুনী রঙের একটা ছাতা বের করে মাথার উপর ধরলো রিতু। তারপর দ্রুত গতিতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলো। ওভারব্রিজের নিচে গাড়ি দাঁড়ানো ছিলো। আগে খেয়াল করি নি। রিতু গাড়িতে ঢুকতেই গাড়িটা ছেড়ে দিলো। দু’পাশে পানি ছিটিয়ে দেখতে দেখতে দৃষ্টিসীমার বাইরে মিলিয়েও গেলো সেটা। আমি রিতুর নাম্বারটা আরেকবার দেখে মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখলাম। বৃষ্টি থেমে যাবে বলে মনে হচ্ছে আজকেই। আমি বিড়বিড় করে নিজের কথা পুনরাবৃত্তি করলাম, “আমি দুঃখিত, রিতু।” জুনোর উপর পুরনো বিরক্তিটা আবার ফিরে এসেছে।

ছয়

বাসার সামনের রাস্তায় জমে থাকা পানি নামতে শুরু করেছে। তিনদিন পর আজকে বৃষ্টিহীন শহর। গাছপালার পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির জল এখনো শুকোয় নি পুরোপুরি। কিছুক্ষণ পরপর প্রবল বেগে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। বাতাসের ঝাপটায় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটা থেকে মাথায় পানি ঝরে পড়তেই আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে ভেবে চমকে উপরে তাকালাম। শুরু হয় নি। হাত দিয়ে মাথা থেকে পানি ঝেড়ে হাঁটতে শুরু করলাম আবার। বাস ধরতে হবে।

প্রত্যেকটা দিন আমরা একটু একটু করে বদলে যাচ্ছি। শুধু আমরা না, আমাদের চারপাশের সবকিছুই বদলাচ্ছে। এই বদলে যাওয়া ঠিক যতটা সুন্দর, ঠিক ততটাই ভীতিকর। কখন যে কে কিভাবে বদলে যাবে আমরা কেউ জানি না। চেনা মানুষ হঠাৎ করে অচেনা হয়ে যায়, অচেনা কাউকে হঠাৎ করেই আপন বলে মনে হয়। সবকিছু বড় এলোমেলো। প্রকৃতি সবকিছু আগে-ভাগে জানতে দেয় না। আগে-ভাগে জানতে না পারার জন্যই ব্যাপারটা ভীতিকর। জুনো অবশ্য মাঝে মধ্যে বলে বদলে যাওয়াকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই,

“রাস্তার একপাশের গাড়িগুলো দেখেছিস ছুটে চলেছে আর অন্যপাশটায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে? কারণ ছাড়া কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। ইউনিভার্সের একটা গ্র্যান্ড প্ল্যান রয়েছে, বুঝলি? সবকিছুই সেই গ্র্যান্ড প্ল্যানের ছোট্ট ছোট্ট অংশ মাত্র। চারপাশে সবকিছু বদলাচ্ছে, দেখে মনে হচ্ছে এলোমেলো, কোন নিয়ম নেই। কিন্তু আসলে সবকিছু কিন্তু সেই গ্র্যান্ড প্ল্যান অনুসারেই হচ্ছে। তাই সেটাকে অকারণ ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সৃষ্টির শুরু থেকে এই বদলানো শুরু হয়েছে। কোন থামাথামি ছাড়া সেটা চলতেই থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না…”

আমি জুনোকে কথার মাঝে থামিয়ে দিয়ে মুচকি হেসে বলি,

“যতক্ষণ পর্যন্ত না ইউনিভার্সের মৃত্যু ঘটে? মহাবিশ্বের তাপীয় মৃত্যু হলো গ্র্যান্ড প্ল্যান?”

জুনো আর কিছু না বলে চুপ করে থাকে। বাস কাঙ্খিত স্টপেজে পৌঁছে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। জানালার পাশ থেকে উঠে বাসের দরজায় এসে দাঁড়ালাম। বাসে অল্পকিছু মানুষ বসে আছে, তবুও হেল্পার গলা ফাটিয়ে চিল্লাচ্ছে,

“কলাবাগান, কলাবাগান…”

নামার জন্য রাস্তায় পা ফেলেতেই কি ভুল করে ফেলেছি বুঝতে পারলাম। রাস্তার দিকে তাকাই নি পা ফেলার সময়। গর্তে জমে থাকা কাদা-পানির মধ্যে পা ফেলেছি। কাদা থেকে পা টেনে তুলে দেখি পায়ের স্যান্ডেল নেই, কাদায় আটকে গেছে। কাদা-পানিতে আবার পা ডুবিয়ে স্যান্ডেল উদ্ধারের চেষ্টা করবো নাকি আরেক পায়ের স্যান্ডেলটাও ফেলে দিয়ে হাঁটা দেবো ভাবছিলাম গর্তের দিকে তাকিয়ে। মধ্যবয়ষ্ক এক লোক এসে পাশে দাঁড়ালো। লুঙ্গি আর শার্ট পরনে, ম্যাচের কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছে। লোকটা মাথা ঝুঁকিয়ে গভীর আগ্রহে গর্তের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“মাছ-টাছ আছে নাকি, ভাইজান, গর্তে?”

এই গর্তের পাশে আর দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয় না। কাদা-পানিতে আবার পা ডুবাতে ইচ্ছে করছে না। স্যান্ডেল চুলোয় যাক। আমি আরেক পাও স্যান্ডেল থেকে বের করে বললাম,

“থাকার সম্ভবনা আছে, কি যেন লাফ দিলো তখন। ভালো করে দেখেন তো!”

বৃষ্টি শুরু হয়েছে আবার, ঝিরিঝিরে বৃষ্টি। হাঁটতে হাঁটতে লেকের পাড়ে নির্দিষ্ট বেঞ্চটার কাছে চলে এলাম। বেঞ্চের মাঝখানটায় তিনটে কদমফুল রাখা। আশেপাশে তাকাতেই মেয়েটাকে চোখে পড়লো। দূরে একটা বেঞ্চে বসে আছে, মাথার ওপর বেগুনী রঙের ছাতাটা ধরা। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নড়ালো রিতু। আমিও একই কাজ করলাম উত্তরে। এই সময়ে মেয়েটা কদমফুল কোথা থেকে জোগাড় করলো কে জানে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, রিতু মৃদু হেসে উল্টো আমাকে জিজ্ঞেস করেছে,

“জাদুকর যদি জাদুর রহস্য বলেই দেয় তাহলে কিভাবে হবে?”

রিতু রাস্তার দিকে হাঁটা শুরু করেছে। আমি বেঞ্চটাতে বসে পড়লাম। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। লেক পানিতে টইটুম্বুর। সুরাইয়ার এতোক্ষণে চলে আসার কথা। বৃষ্টির পানিতে চোখের চশমার কাঁচ ভিজে ঝাপসা হয়ে গেছে। চশমা খুলে শার্টের কাপড় দিয়ে সেটাকে পরিষ্কার করার চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না, শার্টও ভিজে গেছে একদম। দূর থেকে কেউ একজন এদিকে এগিয়ে আসছে দ্রুত পায়ে। বৃষ্টির ভেতর দূরে আবছা অবয়ব দেখতে পাচ্ছি শুধু। চশমার কাঁচে শার্টের কাপড় দিয়ে আরেকবার ঘষা দিয়ে সেটা চোখে লাগিয়ে আবছা অবয়বের দিকে তাকালাম আবার। এখনো বহু দূরে।

( জুন ৫, ২০১৫ )