কন্টেন্টে যাও

নিম্মি #১১

মিস নিম্মি…

নিম্মি উত্তর না দিয়ে রুমটা দেখতে লাগলো। উত্তরের আশা করে কথাটা বলা হয় নি। নিম্মির উপস্থিতি সম্পর্কে যে তিনি সচেতন শুধু সেটা বোঝাতেই কথাটা বলেছেন। টেবিলের পেছনে রিভলভিং চেয়ারটা এখনো অল্প-অল্প ঘুরছে। ডক্টর রহমান মাত্র সেখান থেকে উঠেছেন। উঠে টেবিলের পাশে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে একটা ফাইলের পৃষ্ঠা উল্টে দেখছেন। ফুল ফ্রেম চশমা চোখে, কালো ফ্রেম। হালকা-পাতলা, বয়স খুব বেশি হবে না। নিম্মি মনে করেছিলো উনি আরো বয়ষ্ক কেউ হবেন। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে সদ্য গ্র‍্যাজুয়েট করে বের হয়েছেন। অবশ্য সেটা হওয়ার সম্ভবনা কম। অনেকেরই চেহারা দেখে বয়স আন্দাজ করা যায় না, ইনিও মনে হয় তেমন কেউ। রিভলভিং চেয়ারের পেছনের দেয়ালের প্রায় পুরোটা জুড়েই বুকশেলফ লাগানো। বিভিন্ন ধরণের বই দিয়ে ভর্তি পুরোটা। সবচেয়ে চমৎকার বিষয়টা হচ্ছে রুমটা অনেক উঁচুতে, নয় তলায়। একপাশের দেয়াল পুরোটা কাঁচের। অনেক দূর পর্যন্ত শহর দেখা যায়। দূরের বিল্ডিংগুলোকে মনে হয় মিনিয়েচার। রাস্তার গাড়িগুলোকে দেখতে ইচ্ছে করছে। সেগুলো দেখতে হলে উঠে সেদিকে যেয়ে দেখতে হবে। উঠতে নিম্মির ইতস্ততবোধ হচ্ছে।

চলুন বসা যাক।

নিম্মি ডক্টর রহমানের দিকে তাকালো। নিম্মির দিকে তাকিয়ে তিনি কাঁচের দেয়ালের পাশে রাখা কাউচের দিকে হাত বাড়িয়ে ইশারা করে আছেন। কাঁচের দেয়ালের প্রায় গা ঘেষে মুখোমুখি দু’টো সিঙ্গেল সিটের কাউচ রাখা। নিম্মি উঠে গিয়ে একটাতে বসলো। দেখতে যতটুকু মনে হয় তারথেকেও অনেক বেশি মোলায়েম সেগুলো। বসতেই সিটটা অনেকখানি দেবে গেলো। ডক্টর রহমান নিম্মির অপ্রস্তুত ভঙ্গি দেখে দ্রুত বললেন,

চাইলে চেয়ারে বসতে পারেন।

নিম্মি ঠিক হয়ে বসতে বসতে বললো,

ইটস ওকে…

এখান থেকে রাস্তা দেখা যায়। ডানদিকে মাথা ঘুরিয়ে নিম্মি নিচের দিকে তাকালো। লম্বা সারি দিয়ে রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির দল। পৃথিবীটা মোটেও ছোট হয়ে আসছে না। মানুষ বেড়ে যাচ্ছে। যতদূর পর্যন্ত পারছে প্রকৃতিকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সবুজের রাজত্ব ছোট হয়ে আসছে।

মিস নিম্মি, আপনাকে কি আমি তুমি করে বলতে পারি?

নিম্মি ডক্টর রহমানের দিকে তাকালো। সামনের কাউচে বসেছেন তিনি। খুব সাধারণ একটা ফুল স্লিভ শার্ট পড়েছেন তবে সেটা ফর্মাল না আর গ্যাবাডিনের প্যান্ট। মোটেও অফিসিয়াল ড্রেসআপ না। নিম্মি ফিক করে হেসে ফেলে বললো,

আপনাকে দেখে যেমন মনে হয় মোটেও সেরকম কম বয়ষ্ক নন। হুম, পারেন… তবে…

হাসি সংক্রামক, কাউকে হাসতে দেখলে নিজেরও হাসতে ইচ্ছে করে। ডক্টর রহমানও হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন,

তবে?

আপনার ফার্স্ট নেইমটা বলুন, ডক্টর রহমান ডাকতে ইচ্ছে করছে না।

ডক্টর রহমান কিছু বলার আগেই নিম্মি আবার বললো,

আচ্ছা, দাঁড়ান। অনুমান করি। ফার্স্ট নেইমও ‘আর’ দিয়ে শুরু। হয়েছে?

ডক্টর রহমান মুখের হাসি প্রসারিত করে বললেন,

হয়েছে।

রিশাদ? রাশেদ?

ডক্টর রহমান এবার কিছু না বলে মাথা ঘুরিয়ে টেবিলটার দিকে ইশারা করলেন। নিম্মি সেদিকে তাকালো না। টেবিলের ওপর নেইমপ্লেট রাখা আছে। সেটাতে পরিষ্কারভাবে লেখা, ডক্টর রাশেদ রহমান। নিম্মি সামনের দেয়ালে রাখা সারি সারি বইয়ের উপর চোখ বুলাতে বুলাতে বললো,

আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে। আমরা কখন শুরু করছি তাহলে?

ডক্টর রহমান মৃদু হেসে বললেন,

তোমার যখন শুরু করতে ইচ্ছে হয়। তবে, মিস্টার মেরাজের সাথে আমার কথা হয়েছে। শুরু করার কোন দরকার আছে বলে কিন্তু আমার মনে হচ্ছে না।

তবে আমি শুরু করতে চাচ্ছি।

সম্পূর্ণটাই তোমার ইচ্ছা, মিস নিম্মি।

নিম্মি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,

কোন নিয়ম কি আছে, কোথা থেকে শুরু করবো?

নো রুলস। যেখান থেকে খুশি, যা খুশি।

নিম্মি ভ্রু কুঁচকে বসে থাকলো কিছুক্ষণ। তারপর বললো,

ডক্টর রাশেদ। প্যারেলাল ইউনিভার্স সম্পর্কে পড়েছেন কখনো?

হুম, পড়েছি। পেছনের বুকশেলফটায় খুঁজলে বেশ কিছু বই পাওয়া যাওয়ার কথা এই বিষয়ের। তোমার ইচ্ছা হলে তুমি খুঁজে পড়তে নিয়ে যেতে পারো তোমার সাথে।

আপনি কি আপনার সব পেশেন্টকেই বই নিয়ে যেতে দেন?

নাহ। তবে, তোমাকে দেওয়া যেতে পারে।

কেন দেওয়া যেতে পারে সেটা জিজ্ঞেস করতে যেয়েও নিম্মি থেমে গেলো। ডক্টর রাশেদের মুখে খুব সূক্ষ্মভাবে হাসির একটা রেখা ফুটে উঠেছে কথাটা বলার সময়। সেটা মোটেও আনন্দের হাসি না। হাসির ভেতর অনেককিছু লুকিয়ে আছে। সেদিকে তাকিয়ে নিম্মি অন্যমনষ্কভাবে মৃদুস্বরে বললো,

আপনার কি কখনো মনে হয়েছে, প্যারেলাল ইউনিভার্সের সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই খুব বেশি নির্মম… হৃদয়হীন?