কন্টেন্টে যাও

নিম্মি #১০

তিথি মোবাইলটা রেখে বেলকনির দরজায় এসে দাঁড়ালো। হাত বাড়িয়ে দিলো দরজার বাইরে। অদ্ভুত রকমের শীতল বৃষ্টির পানি। বৃষ্টিতে না নেমেও শীত-শীত লাগছে। পুরনো স্মৃতি কুঠুরি থেকে বৃষ্টির টানে বাইরে বেরিয়ে আসছে। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিলো তিথি। বিকেল বেলা, ক্লান্ত বিকেল। ক্লান্ত বিকেলের আকাশ মেঘের চাদর টেনে নিজেকে মুড়িয়ে ফেলেছে। বাস আসছে একটার পর একটা, পা ফেলে দাঁড়ানোর জায়গাও নেই সেসবে। মেঘ একবার গুরগুর শব্দ করে উঠলো। সাথে সাথেই ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি। কোন দু’টো মেঘের খণ্ড মিলে শব্দ করে উঠলো দেখার জন্য তিথি আকাশে দিকে তাকিয়েছিলো। বৃষ্টির একটা ফোঁটা তার কপালে এসে পড়লো। কেউ বলে দেয় নি, কিন্তু তিথীর মনে হলো বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা তাকে এসে ছুঁয়েছে।

পিইই…

তিথির জামার নিচের কোণা ধরে কেউ টানছে। তিথি সেদিকে তাকিয়ে হাসলো। হাত মুঠো করে চোখ কচলাতে কচলাতে ইমন জিজ্ঞেস করলো,

পিইই, আকাশ থেকে পানি পড়ছে কেনো?

অবাক মুখে ইমন বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশের ঠিক কোথা থেকে পানি পড়ছে সেটা দেখার চেষ্টা করে। তিথির হাতের দিকে চোখ পড়তেই আবার অবাক হয়ে বললো,

তুমি হাত দিয়ে আছো কেনো পানিতে? আকাশ থেকে যদি কেউ হিসু করে!

তিথি নাক কুঁচকে ইমনের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। ভেজা হাতের আঙুল নাড়িয়ে ইমনের মুখ ভিজিয়ে দিলো। ইমন দু’পা পিছিয়ে গিয়ে নিজের টি-শার্ট টেনে মুখ মোছায় ব্যস্ত হয়ে গেলো। মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে যেতে বলতে থাকলো,

তুমি পঁচা পিইই। তুমি অনেক পঁচা পিইই। হিসু, ছিঃ…

এই পিচ্চি! কই যাস? এদিকে আয়!

ইমন কথা শোনে না। গটগট করে হেঁটে যেতে থাকে। ছোট ছোট পা ফেলে হেঁটে যেতেও সময় লাগে। ততক্ষণে তিথি উঠে এসে পেছন থেকে চেপে ধরে ফেলছে ইমনকে। আগের জায়গায় গিয়ে ইমনকে কোলের উপর নিয়ে বসে পড়লো তিথি। ইমনও কোন কথা বলে না। থম মেরে বসে থাকে। ছোট্ট মুখে গম্ভীর ভাব দেখলেই হাসি পেয়ে যায় তিথির। হাসি চেপে জিজ্ঞেস করলো,

কি হলো পিচ্চির? রাগ করেছিস?

ইমন কথা না বলে বেলকনির মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে। পানি জমেছে অল্প। উপর থেকে যখন পানির ফোঁটা এসে পড়ছে সেগুলোর উপর তখন সেগুলো ছিটকে উঁচু হয়ে পাশে সরে যাচ্ছে।

আকাশে মেঘ দেখেছিস?

ইমন বেলকনির মেঝে থেকে চোখ তুলে মেঘের দিকে তাকায়। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে তিথির মুখের দিকে তাকাতে চেষ্টা করে। তিথি এবার আকাশ থেকে পানি পড়ার ব্যাখ্যা দেয়,

ঐ মেঘগুলো যখন অনেক ঠান্ডা হয়ে যায় তখন সেখান থেকে পানি পড়ে।

ইমন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,

ঠান্ডা… ঠান্ডা পানির গ্লাসে যেমন পানি জমে তেমন?!

তিথি প্রায়ই অবাক হয়ে যায় ইমনের কথা শুনে। পিচ্চি এই ছেলেটার মাথা খুবই পরিষ্কার। অত্যন্ত দ্রুত অনেক কিছু ধরে ফেলে। হাসিমুখে তিথি উত্তর দিলো,

হুম, তেমনই।

আকাশে মেঘ আসলো কোথা থেকে পিইই?

মেঘ আসার ব্যাখ্যা এই পিচ্চিকে কিভাবে দেওয়া যায় তিথি বুঝে উঠতে পারে না। অবাক হওয়ার ভান করে বলে,

তা তো জানি না রে! কোথা থেকে আসে বলতো!

জানি না, পিইই। জানো পিইই, আকাশের মন খারাপ! অনেক মন খারাপ! মেঘে লুকিয়ে থাকে তাই…

বলেই তিথির কোল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মায়ের খোঁজে পা ফেলতে থাকে, মামণি! মামণি!

তিথি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। এই পিচ্চির অদ্ভুত কিছু একটা ব্যাপার আছে। মাঝেমাঝেই পিচ্চির কথা শুনে অবাক হওয়া ছাড়া কিছু করার খুঁজে পাওয়া যায় না। তিথি বেলকনিতে বেরিয়ে পড়লো। জমে থাকা পানিতে হাঁটতে মজা লাগছে। পা ফেললেই পানিতে ছপ-ছপ করে শব্দ হয়, ছিটকে সরে যায়। তিথির পানি ছিটিয়ে নাচতে ইচ্ছা করছে। সে ইচ্ছেটাকে সযন্তে চেপে রেখে শান্ত হয়ে দাঁড়ায় রেলিংয়ের পাশে। সামনে এক হাত মেলে ধরে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কি আসলেই একই রকম? বৃষ্টির ঠান্ডা পানিতে তিথি মৃদু কাঁপতে থাকে। কাঁপতে কাঁপতে তিথির অদ্ভুত অনুভূতি হয়। অস্পষ্টভাবে মনে হয় গলার কাছে কি যেন আঁটকে আছে। এটা আনন্দ নাকি কষ্টের অনুভূতি তিথি ধরতে পারে না। আনন্দ আর কষ্ট ব্যাপারটাই বোধহয় এরকম। হঠাৎ হঠাৎ একসাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। একটা থেকে আরেকটা তখন আর আলাদা করা যায় না। মেঘ গুরগুর করে ওঠে। তিথির মনে হতে থাকে মেঘ বুঝি তার দিকে তাকিয়ে হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করছে, পারছে না। সেই হাসিতে কি আছে? মমতা নাকি তাচ্ছিল্য? ছপ-ছপ শব্দ করে পা ফেলে তিথি আবার বেলকনিতে হাঁটা শুরু করে। তিথির নাচতে ইচ্ছে করছে…