কন্টেন্টে যাও

নিম্মি #৪

গল্প বলে শেষ করার পর অনেকটা সময় মেরাজ সাহেব চুপ করে বসে থাকলেন। আগেকার দিনে রাতের নিস্তব্ধতার সাথে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ভাব ছিলো। সবকিছু চুপ হয়ে যাওয়ার পর ঝিঁ ঝিঁ পোকারা ডেকে উঠতো। একটানা একঘেয়ে সেই ডাকের ভেতর ঘোর লাগা একটা ব্যাপার ছিলো। কিছুক্ষণ শুনলে ঘোর লেগে যেতো, সময়ের হিসাব থাকতো না আর তখন। ঝিঁ ঝিঁ পোকারা এখন নিরুদ্দেশ। শহর ছেড়ে হয়তো পালিয়েছে। গ্রামের রাতে কি এখনও ঝিঁ ঝিঁ পোকারা ডাকে? নিম্মিকে নিয়ে সময় করে গ্রাম থেকে ঘুরে আসতে হবে একবার। সপ্তাহখানেক গ্রামে থেকে আসবেন কন্যার সাথে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকের সাথে গ্রামে ছিলো জোনাকির দল, ঝাঁক বেঁধে জ্বলতো-নিভতো। মেরাজ সাহেবের ছেলেবেলা কেটেছে গ্রামে। সন্ধ্যা হতেই নিস্তব্ধতা ভর করতো বাতাসে। ঘরের জানালা চুইয়ে হারিকেনের টিমটিমে আলো এসে পড়তো উঠোনে। হেঁসেলে হয়তো মা-দাদি বসে থাকতেন, রান্নার কাজে ব্যস্ত। চুলোয় ভাত চড়িয়ে দিয়ে মাঝে মাঝে আগুন উস্কে দিতেন, গল্প করতেন কত কিছু নিয়ে। মেরাজ সাহেব ছোটচাচার চোখ ফাঁকি দিয়ে বই ফেলে ঘর থেকে বের হয়ে পড়তো। উঠোনের কোনায় ঝোঁপ-ঝাড়ে জোনাকি ধরে বেড়াতো। মাঝে-সাঁঝে সন্ধ্যাবেলায় বাড়ির উঠোনে গল্পের, গানের আসর বসতো। আশেপাশের বাড়ি থেকেও লোকজন এসে জুটতো আসরে। সেসব দিন ছিলো আনন্দের, পড়াশোনা থেকে মাফ। ছোটচাচার কড়া নজর ফাঁকি দিয়ে পালানোর মতো ঝুঁকির কাজ করতে হতো না, ধরা খেয়ে শাস্তি পাওয়ার ভয় থাকতো না। হাঁ করে বসে দাদার বলা ভূতের গল্প গিলতো আর গল্পের ফাঁকে ফাঁকে দু’হাতের আঙুলের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে বন্দী করা জোনাকীর আলো দেখতো। বড়রাও সেসব গল্পে আপত্তি করতো না, ছোটদের মতোই সমান উত্তেজনায় বড় বড় চোখে চেয়ে শুনে যেতো। গল্প শেষ হলে সেসব নিয়ে আলোচনা শুরু হতো, আলোচনার বিষয় ঘুরতে ঘুরতে অন্যদিকে মোড় নিতো। ছোটদের উৎসাহে ভাটা পড়তো, সমবয়সীদের সাথে লুকোচুরি খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়তো তারা। ভূতের গল্প শোনার পর চাঁদের আলোয় আধো-আঁধারে সেসব লুকোচুরি খেলা হতো ভয়াবহ উত্তেজনাময়।

নিম্মি, গ্রাম থেকে একবার ঘুরে আসলে কেমন হয়?

সাড়া না পেয়ে মেরাজ সাহেব ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করেন কন্যাকে। ঘুমিয়ে পড়েছে কাঁধের উপরেই। কন্যার মাথায় হাত রেখে আবার ডাকেন তিনি। এবার নিম্মির সাড়া পাওয়া যায়। মাথা উঠিয়ে চোখ কচলে অস্ফুট শব্দ করে,

হু?

রাত অনেক হয়ে গেছে রে। ঘুমিয়ে পড় গিয়ে যা।

হুম…

ঘুমের রেশ কাটে নি নিম্মির, হুম বলেও বেশ কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকলো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললো,

হুম, যাচ্ছি। তুমিও আর বসে থেকো না, ঘুমিয়ে পড়ো।

মেরাজ সাহেব বললেন,

হুম, যাচ্ছি।

‘হুম, যাচ্ছি’ না, ওঠো।

হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে একটা হাই ঠেকিয়ে বাবার হাত ধরে টান দিলো নিম্মি। মেরাজ সাহেব হেসে ফেলে উঠে পড়লেন। মেরাজ সাহেবকে রুমে ঢুকিয়ে নিম্মি নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো। রুমে ঢুকেই ঝপ করে বালিশের উপর মাথা দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। চোখ বুজতেই বালিশের পাশে রাখা মোবাইলটায় ম্যাসেজ টোন বেজে উঠলো। চোখ বোজা অবস্থাতেই হাতড়ে সেটা খুঁজে উপুড় করে রাখলো নিম্মি। ঘুমের মাঝে মোবাইলের শব্দ বিরক্তিকর ব্যাপার। সকালে উঠে ম্যাসেজ পড়া যাবে, এখন নিম্মির ঘুমে ডুবে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করতে ইচ্ছে করছে না।