কন্টেন্টে যাও

নিম্মি #৫

নিম্মি চোখ মেলে সিলিংয়ে ঝুলন্ত ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণটা ধরা যাচ্ছে না। মোবাইল সাইলেন্ট করা, সেটা বাজে নি। লোডশেডিং শুরু হয় নি, ফ্যান ঘুরছে। অবশ্য লোডশেডিং শুরু হলেও ফ্যান ঘুরবে, ইলেক্ট্রিসিটি ব্যাকআপ আছে। চিন্তা করতে করতেই নিম্মি খেয়াল করলো বাইরে একটানা শব্দ হচ্ছে, বৃষ্টির শব্দ। নিম্মি উঠে বসে মোবাইলে সময় দেখলো, ভোর হয়ে গেছে প্রায়। নিম্মির ঘরের সাথে লাগোয়া ছোট একটা বারান্দা। বিছানা থেকে নেমে বারান্দার সাথের জানালাটা থেকে পর্দা সরিয়ে খুলে দিলো সে। মূহুর্তের জন্য বাইরের সবকিছু স্পষ্ট হয়ে ধরা দিলো উজ্জ্বল আলোতে। প্রায় সাথে সাথেই নিম্মি চোখ-মুখ কুঁচকে ফেললো বিকট শব্দে, আশেপাশে কোথাও বজ্রপাত হয়েছে। মনে হয় যেন আকাশে চির ধরে হুড়মুড় করে সব ভেঙে পড়ছে। শুধু বৃষ্টি না, রীতিমতো ঝড় শুরু হয়েছে। রাস্তার পাশে গাছপালা এপাশ-ওপাশ করছে ঝড়ো বাতাসে। মাঝে মাঝেই বিদ্যুৎ চমকে উঠছে, সাথে মেঘের গর্জন। সংবাদপত্রের বিশাল আকারের একটা কাগজ নিম্মির বারান্দার সামনে দিয়ে উড়ে গেলো। বৃষ্টির ঝাপটা বারান্দা পেরিয়ে জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ছে। একেকটা ঝাপটা আসছে আর নিম্মির অপেক্ষা শুরু হচ্ছে পরেরটার জন্য। নিম্মি আর ঘুমালো না। বারান্দার দরজা খুলে দরজার পাশে একটা টুল নিয়ে বসে থাকলো পুরোটা ভোর। ভোরের আলো ফুটতে অন্যদিনের তুলনায় কিছুটা দেরি হলো মেঘের কারণে। অবশ্য নিম্মি সেটা টের পেলো না, এতো আগে তার কখনোই ঘুম থেকে ওঠা হয় না। তবুও মেঘ ঘেঁষে একসময় সূর্যের আলো ঢুকে পড়লো চুপচাপ। ঝড়ো বাতাস পড়ে গেলো একসময়, বৃষ্টির জোরও কমে গেলো। একটানা ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়তে থাকলো। নিম্মি উঠে যেয়ে ভেজা বারান্দায় স্টিলের রেলিং ধরে দাঁড়ালো, রেলিংয়ের কাছে যাওয়ার সময় পা পিছলে পড়ে যেতে গিয়ে নিজেকে সামলালো। পিচ ঢালা রাস্তাগুলো থেকে ধুলোবালি ধুয়ে গেছে, এখন সেগুলো মিশমিশে কালো। বৃষ্টি ভেজা রাস্তাগুলোকে বড় আপন মনে হয়। ঝিরঝিরে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মেঘের গুরগুর শব্দ শুনতে শুনতে হাঁটার জন্য রাস্তাগুলো নির্বাক ডাক ডাকতে থাকে। গ্রামের পথগুলোও কি এরকম হয়? ছোটবেলা থেকে কখনো গ্রামে যাওয়া হয় নি নিম্মির। রিশাদের কাছ থেকে নিম্মি শুনেছে, গ্রামের বৃষ্টি নাকি শহুরে বৃষ্টি থেকে শতগুণে চমৎকার। গ্রামের টিনের চালা দেয়া ঘরের বারান্দায় বসে বৃষ্টির শব্দ শোনার মতো চমৎকার ব্যাপার নাকি পৃথিবীতে কমই আছে। কথায় কথায় চমৎকার শব্দটা ব্যবহার করার বাতিক আছে রিশাদের। কলেজের ক্লাস শুরু হওয়ার প্রথম দিন। টিচার ক্লাসে ঢুকে সবার সাথে কথাবার্তা বলছেন, পরিচিত হচ্ছেন। নিম্মি ক্লাসের পিছনের দিক থেকে তিন নম্বর সারিতে বসেছে। কাঁধে টোকা খেয়ে নিম্মি পেছনে তাকালো, পেছনের ডেস্কে চশমা চোখে এলোমেলো চুলের একটা ছেলে বসে আছে। নিম্মি তাকাতেই হড়বড় করে বললো,

এই ম্যা’মের সম্পর্কে শুনেছো? তাঁর মতো চমৎকার বিরক্তিকর ম্যা’ম নাকি এই কলেজে সেকেন্ড পিস নাই। দুর্ভাগ্য, আমাদের ক্লাসের শিডিউলে সে আছে…

নিম্মি ভ্রু কুঁচকে ছেলেটার দিকে তাকালো। চমৎকার আর বিরক্তিকর শব্দ দু’টা এই ছেলে একসাথে ব্যবহার করলো নাকি তার শুনতে ভুল হয়েছে বুঝতে পারছে না। আর ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই বা কে টিচারদের সম্পর্কে খোঁজ করে! ছেলেটা ভ্রু কুঁচকানো দৃষ্টির দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে বলতে থাকলো,

যাই হোক, সেটা পরে দেখা যাবে, নাম কি তোমার?

নিম্মি ভ্রু কুঁচকেই উত্তর দিলো,

নিম্মি…

হুম, নিম্মি। আমি রিশাদ। পরে কথা হবে। ম্যা’ম তোমাকে ডাকছে মনে হয়।

নিম্মি সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলো টিচার তার দিকে আঙুল তুলে হাসিমুখে বলছেন,

ইয়েস গার্ল, ইউ। তোমার নাম কি?

নিম্মি উঠে দাঁড়িয়ে উত্তর দিলো,

নিম্মি।

উত্তর শুনে টিচারের মুখ থেকে হাসি ফট করে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। গম্ভীর মুখে বললেন,

আমি তোমার পুরো নামটা জানতে চাচ্ছিলাম।

কখনো গ্রামে যাওয়া হয় নি দেখে নিম্মি রিশাদের কথার উত্তরে কিছু বলতে পারে নি। তবে নিম্মির মনে হয়, গ্রামের বৃষ্টির সাথে শহুরে বৃষ্টির তুলনা করার কোন মানে নেই। সৌন্দর্য তুলনা করার মতো কোন বিষয় না। গ্রাম থেকে একবার বেড়িয়ে আসতে পারলে খারাপ হতো না। বর্ষাকাল চলছে, টিনের চালা দেয়া ঘরের বারান্দায় বসে বৃষ্টির শব্দ শোনার চমৎকার অভিজ্ঞতাটাও হয়ে যেতো। বাবাকে বলতে হবে মনে করে। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মাঝেও ভিজতে ভিজতে একটা কাক কোথা’ থেকে উড়ে এসে বারান্দার পাশে একটা গাছের ডালে বসলো। নিম্মি সেটার দিকে তাকাতেই সেটা ডেকে উঠলো,

কা কা।