কন্টেন্টে যাও

নিম্মি #৭

কলেজ ছুটি হয়ে গেছে। নিম্মি দাঁড়িয়ে আছে দো’তলার বারান্দায় রেলিং ধরে। দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির ঠান্ডা স্পর্শ বাতাসে ভেসে আসছে। রায়হান চাচা মোবাইলে ম্যাসেজ দিয়েছে একটু আগে। গাড়ি নিয়ে আসতে একটু দেরি হবে। রাস্তায় জ্যামের মধ্যে পড়েছে গাড়ি। এই জ্যাম ব্যাপারটাকে নিম্মি ঠিক পছন্দ করবে নাকি অপছন্দ করবে বুঝতে পারে না। সময় নষ্ট হয় ঠিকই কিন্তু যখন গাড়ি জ্যামে বাঁধে তখন নিম্মি চুপচাপ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। শব্দহীন শহুরে ব্যস্ততা দেখতে বেশ লাগে। নিম্মি ফুটপাতে পথিকদের হেঁটে চলা দেখে। দেখে পানির বোতল, পপকর্নের প্যাকেট নিয়ে গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ানো শুকনো ছেলেগুলোকে; কিংবা বেলী ফুল, বকুলের মালা, রজনীগন্ধার স্টিক হাতে মলিন চেহারার মেয়েগুলোকে, কখনো হয়তো লাল গোলাপ। রাস্তা পারাপারের দৃশ্যগুলো দেখে নিম্মি। বাবা-সন্তানের রাস্তা পারাপার। নববিবাহিত দম্পতির রাস্তা পারাপার; এদের দেখেই বোঝা যায়, বিয়ে হয়েছে বছর গড়ায় নি। প্রেমিক-প্রেমিকার রাস্তা পারাপার; অনেকে হাত ধরে, অনেকে না ধরে, সংকোচ এখনো কেটে উঠতে পারেনি। বেকার যুবকের রাস্তা পারাপার অথবা ভবঘুরে। ভিক্ষুক, অন্ধ, দুঃখীদের পারাপার কিংবা সুখীদের। অন্যদের চোখে এসব আলাদাভাবে ধরা দিতে না পারে কিন্তু নিম্মি চোখে ধরা দেয়। বহু বছর ধরে গাড়িতে বসে সে এসব খেয়াল করে আসছে। বর্ষাকালটা আরো চমৎকার, তখন অদ্ভুত সব দৃশ্য চোখে পড়ে। ক্যামেরায় বন্দি করে ফেলতে ইচ্ছে করে সেগুলো। অবশ্য ঐ ইচ্ছে পর্যন্তই থেকে যায় সেটা, সবকিছু বন্দি করা যায় না, সবকিছুকে বন্দি করতে নেই।

এখনো দাঁড়িয়ে আছিস যে?

চমকে উঠে নিম্মি পাশে তাকালো। রিশাদ এসে দাঁড়িয়েছে কখন। নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে আঙুলে ভর দিয়ে একবার উঁচু হচ্ছে আবার নিচু হয়ে পায়ের পাতায় ফিরে যাচ্ছে। নিম্মি কিছু বলার আগেই রিশাদ আবার বললো,

গাড়ি জ্যামে আটকেছে?

হ্যাঁ, দেরি হবে। তুই এরকম লাফালাফি করছিস কেন?

রিশান চট করে স্থির হয়ে গেলো।

কই? লাফালাফি করবো কোন দুঃখে?

নিম্মি চোখ সরু করে বললো,

কিছু বলবি?

হুম, তোদের ড্রাইভারকে আসতে মানা করে দে।

কেন?!

এতো কেন-কেন করিস কেন রে? একটু দেরি করে বাসায় গেলে নিশ্চয়ই অসুবিধা হবে না। অবশ্য, হলে আলাদা ব্যাপার…

আজব! কিজন্য সেটা বলবি তো?

এমনি, তোকে নিয়ে চমৎকার একটা কাজ করতাম।

নিম্মি হেসে ফেললো।

তোর কাছে তো সবকিছুই চমৎকার মনে হয়।

রিশাদ এক মুহুর্ত ভেবে বললো,

আচ্ছা থাক, বাদ দে।

বলেই চিন্তিত মুখে উল্টো ঘুরে সিড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলো। নিম্মি মোবাইল বের করে রায়হান চাচাকে ম্যাসেজ লিখলো। সেটা পাঠিয়ে রিশাদকে কল দিলো। কল রিসিভ করা হলো ওপাশ থেকে,

হ্যালো…

হ্যালো, তুই কই? দাঁড়া, আমি আসছি।

তুই মিটমিট করে হাসছিস কেন?

আমি হাসছি তোকে কে বললো?

নিচে তাকা।

নিচে নিম্মির দিকে তাকিয়ে রিশাদ দাঁড়িয়ে আছে। রিশাদকে চোখে পড়তেই নিম্মি মোবাইল কান থেকে নামিয়ে জিভ বের করে ভেংচি কাটলো। রিশাদ একদিকের ভ্রু উঁচু করে সেদিকে তাকিয়ে থাকলো। প্রত্যেকটা মানুষের মাঝেই সম্ভবত শিশুসুলভ কিছু ব্যাপার রয়ে যায় সারাজীবন। কখনো লুকিয়ে থাকে, কখনো দেখা দেয় কিন্তু পুরোপুরি হারিয়ে যায় না কখনোই। হারিয়ে যাওয়া কি এতোই কঠিন?