কন্টেন্টে যাও

খোপকাটা জ্যোৎস্না

আরেকটা ক্লান্তিকর দিন শেষ করে যখন ছেলেটা ঘুমানোর জন্য ধপ করে বিছানায় পড়ে গেলো তখন তার খেয়াল হলো বালিশের নিচে রেখে দেয়া মোবাইলটায় এলার্মের টাইম ঠিক করে দেয়া হয় নি। এলার্মের টাইম আরো এক ঘন্টা এগিয়ে দিয়ে মোবাইলটাকে বালিশের নিচে ঢুকিয়ে ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লো ছেলেটা।

মাথার নিচে বালিশটার কাঁপাকাপিতে যখন ছেলেটার কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলো তখন ঘরের পাশের বারান্দাটাকে নরম আলোয় ভাসিয়ে মেঘের পেছনে মুখ লুকানোর প্রস্তুতি কেবল শেষ করেছে চাঁদটা। ঝট করে উঠে বসে কিসের জন্য ঘুম ভাঙলো বুঝে উঠতে না পেরে জানালা দিয়ে বারান্দার মেঝেতে জ্যোৎস্নার খোপকাটা নকশার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ছেলেটা যখন ঘুমের ঘোরলাগা জগৎ থেকে একটু করে বের হতে শুরু করলো তখন তার খেয়াল হলো বালিশের নিচে রাখা মোবাইলটা কারো ডাকের জানান দিতে ক্রমাগত কেঁপেই যাচ্ছে। মোবাইলের স্ক্রিণে অচেনা নম্বরের দিকে চেয়ে থেকে যখন সে বড় একটা হাই তোলার পর সেটাকে কানে চেপে ধরলো, কিছু বলার আগেই ওপাশের ঘুম লেগে থাকা মায়ামাখা কণ্ঠ শোনা গেলো, “ঘুমিয়ে পড়েছিলে?”

কিছুক্ষণ চুপ করে বারান্দার মেঝেতে মিলিয়ে যেতে থাকা জ্যোৎস্নার খোপকাটা নকশার দিকে তাকিয়ে থেকে ছেলেটা কি বলবে ভেবে নিয়ে মুখ খুললো, “হুম। তুমিও তো ঘুমাচ্ছিলে মনে হয়। ঘুম লাগা কণ্ঠে কথা বলছো।”

আরো কিছুক্ষণ নীরবতায় চাঁদটা মেঘের পেছনে লুকিয়ে যেতে থাকলো অথবা মেঘগুলোই হয়তো চাঁদটাকে লুকিয়ে ফেলছিলো কিংবা কে জানে হয়তো দু’টোই, “এখনো ঘুমাই নি, জেগেছিলাম।”

ছেলেটা বলার মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে চুপ করে শূন্য দিয়ে ভেসে আসা শো-শো আওয়াজ শুনতে লাগলো, খুব সম্ভবত মোবাইলের ওপাশে ঘরটার ছাদে ঝুলন্ত মাতালভাবে ঘুরতে থাকা ফ্যানটার আর্তনাদ। আর্তনাদ ছাপিয়ে মেয়েটার মায়া জড়ানো কথা আবার শোনা যায়, “কি হলো, রাকিব? চুপ করে আছো যে?”

“ভাবছি…” উত্তরের সাথে ছেলেটা লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস বের করে দেয় বুক থেকে, জানালা দিয়ে দেখতে পাওয়া গাছটার পাতা সামান্যই দুলে ওঠে তাতে, চোখ দিয়ে তা দেখতে পাওয়া যায় না।

“কি ভাবছো?”

“ভাবছি, এই রাকিবটা কে…”

চট করে মোবাইলের অদৃশ্য সুতোটা কেটে যায়, কিছুক্ষণ একঘেয়েমি বিপ-বিপ শব্দ তুলে সেটাও নীরব হয়ে যায়, রাতের বাতাসে ভেসে বেড়ানো প্রকৃতির দীর্ঘশ্বাস তখন কিছুটা কানে আসে। প্রকৃতির সাথে দীর্ঘশ্বাস মিলিয়ে রাকিবও দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মায়ালাগা কণ্ঠের অধিকারী মেয়েটা এখন মোবাইলে নম্বর চেক করছে, চেক করে যখন দেখবে সেটা রাকিবের নাম্বারই তখন মোবাইলটা তার ডাক জানান দিতে আবারও কাঁপতে থাকবে। নীরবতার মাঝে মায়া-মায়া কণ্ঠ ছাড়াও তখন খিলখিলিয়ে হাসির শব্দ শোনা যাবে, ঘুম জড়ানো বিষাদমাখা খিলখিল হাসি।

কালকে সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে, ফসকে যেতে থাকা সময় থেকে যদি কিছুটা ছিনিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু বেশ খানিকক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকার পরও যে রাকিব নামের ছেলেটার ঘুম আসছে না তার পেছনে প্রকৃতির লুকিয়ে রাখা কিছু কারণ আছে। সে যদি উঠে বসে বিছানার পাশে জানালাটার পর্দাটা সরিয়ে বাইরে তাকাতো তাহলে দেখতো বহুদিন আগের মতো বারান্দার মেঝে জুড়ে শুয়ে থাকা জ্যোৎস্নার খোপকাটা নকশাগুলো তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। তবে প্রকৃতির সেই সুপ্ত ইচ্ছার সাথে ছেলেটার ইচ্ছার বিন্দুমাত্র মিলও নেই, চোখ বন্ধ করে সে ঘুমোনোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। ঘরের ছাদে ঝুলন্ত মাতালভাবে ঘুরতে থাকা ফ্যানটা তার ক্যাঁচ-ক্যাঁচানো অদ্ভুত ভাষায় ছেলেটার জন্য ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে যাচ্ছে, ক্লান্ত এই ছেলেটার নির্ঘুম রাত তার বড় খারাপ লাগে।

( মার্চ ৫, ২০১৪ )